যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহামের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা যতই জোরালো হচ্ছে, ততই সামনে আসছে তার দীর্ঘদিনের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ (ডেভল্যুশন) নীতির সমালোচনা।
ব্রিটিশ গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, দেশটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতা ও অর্থায়নের ভারসাম্য, আর সেই প্রেক্ষাপটে “ব্রিটেনের শেষ যে জিনিসটি প্রয়োজন, তা হলো আরও বেশি সাদিক খান”।
বিশ্লেষণে বলা হয়, গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহাম ডেভল্যুশনের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক প্রভাব, দৃশ্যমানতা, বাজেট এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা পেয়েছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় কোনো সমস্যা দেখা দিলে ওয়েস্টমিনস্টারের ওপর দায় চাপানোর সুযোগও পেয়েছেন।
সমালোচকদের মতে, ব্রিটেনে ডেভল্যুশন স্থানীয় জবাবদিহিতা ও কার্যকর প্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা নতুন প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করেছে। স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিশেষ করে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টিকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ককে ছোট রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দুর্বল জবাবদিহিতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রবন্ধে লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের প্রশাসনকেও কঠোর সমালোচনার মুখে ফেলা হয়েছে। লেখকের দাবি, খানের মেয়াদকালে দোকান থেকে চুরি, ভাড়া ফাঁকি এবং পরিবহন ব্যবস্থার নানা সমস্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে আল্ট্রা লো এমিশন জোন প্রকল্প সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে, যা বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ ও পেনশনভোগীদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, গ্রেটার ম্যানচেস্টারকে ডেভল্যুশনের সফল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তব চিত্র ততটা ইতিবাচক নয় বলেও দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাস সার্ভিস সংস্কার এবং পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে কেন্দ্রীয় সরকার বিপুল অর্থ সহায়তা দিলেও বার্নহাম বারবার ওয়েস্টমিনস্টারের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন।
এছাড়া গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশের অপরাধ রেকর্ডিং ব্যর্থতা এবং ‘ক্লিন এয়ার জোন’ প্রকল্পে শত মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ের পরও জনরোষের মুখে তা বাতিল হওয়ার বিষয়গুলোও সমালোচনার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, ব্রিটেনের স্থানীয় সরকারগুলো মোট কর রাজস্বের মাত্র ৫ শতাংশ সংগ্রহ করলেও সরকারি ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ পরিচালনা করে। ফলে তারা ব্যয়ের দায় কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে, অথচ আয় সংগ্রহের পূর্ণ দায়িত্ব বহন করে না। এতে ক্ষমতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলে মত দিয়েছেন লেখক।
তবে একই সঙ্গে স্বীকার করা হয়েছে যে, যুক্তরাজ্য বিশ্বের অন্যতম কেন্দ্রীয়কৃত রাষ্ট্র এবং স্থানীয় পর্যায়ে অধিক ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষে যৌক্তিক যুক্তিও রয়েছে। কিন্তু সুইজারল্যান্ড, কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রকৃত ফেডারেল ব্যবস্থায় যে আর্থিক দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা থাকে, ব্রিটিশ ডেভল্যুশন কাঠামোয় তা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি অ্যান্ডি বার্নহাম ভবিষ্যতে ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছান, তাহলে আঞ্চলিক নেতাদের আরও ক্ষমতা ও অর্থ বরাদ্দের দাবিকে তিনি আগের মতো সমর্থন করবেন কি না, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন। কারণ বিরোধী অবস্থানে থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করা সহজ হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন হয়ে যায়।
এ কারণেই ডেভল্যুশন নিয়ে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি প্রশ্ন—ব্রিটেন কি আরও বেশি ক্ষমতাবান আঞ্চলিক মেয়র চায়, নাকি শক্তিশালী কিন্তু অধিক জবাবদিহিমূলক একটি জাতীয় প্রশাসনিক কাঠামো?
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

