9.7 C
London
October 25, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

ফ্রান্সজুড়ে লাখো মানুষের বিক্ষোভঃ প্যারিসে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গ্রেপ্তার প্রায় ১,০০০

ফ্রান্সজুড়ে স্কুলের শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পুলিশের কঠোর আচরণের প্রতিবাদে লাখো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচির বেশির ভাগ শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বিক্ষোভের ঘটনায় প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শুধু রাজধানী প্যারিসেই অন্তত ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা অন্তত ৪ লাখ বলে জানিয়েছে সরকার। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সরকারি হিসাবের দ্বিগুণ।

বিক্ষোভকারীরা স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, জরাজীর্ণ ভবন মেরামত এবং অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপে শ্রেণিকক্ষে তৈরি হওয়া সংকট সমাধানের দাবি জানান। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমনে পুলিশের কঠোর ভূমিকারও সমালোচনা করেন তারা। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান না করে সরকার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মোকাবিলায় দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করছে।

প্যারিসের বিক্ষোভের শুরুটা ছিল শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর। মিছিলে বাদ্যযন্ত্রের দল অংশ নেয় এবং অনেক অভিভাবক শিশু ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে রাস্তায় নামেন। বিভিন্ন ব্যানারে সরকারের সমালোচনা করে লেখা ছিল, ‘দমন-পীড়ন বিদ্রোহের জন্ম দেয়’ এবং ‘প্রতিবাদ করার অধিকার চাই’।

তবে প্যারিসের পূর্বাঞ্চলের পোর্ত দ্য ভিনসেন এলাকায় মিছিলের শেষ পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কালো পোশাক ও মুখোশ পরা কয়েকটি দল পুলিশের দিকে কাচের বোতল ও পাথর ছুড়তে থাকে। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও বিস্ফোরকধর্মী শব্দসৃষ্টিকারী গ্রেনেড ব্যবহার করে। এ সময় একটি আবর্জনার পাত্রে আগুন দেওয়া হয় এবং পুলিশের দিকে আতশবাজিও ছোড়া হয়। পরে দাঙ্গা পুলিশ বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশের ওপরও লাঠিচার্জ করে।

লিওঁ, লিল, মন্টপেলিয়ে, নঁত ও তুলুজ শহরে বিক্ষোভকারীদের নগরকেন্দ্রে প্রবেশ ঠেকাতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। মার্সেই শহরেও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় কয়েকটি আবর্জনার পাত্রে আগুন দেওয়া হয়। ক্লেরমঁ-ফেরঁ ও তুলুজে অন্তত দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তুলুজে আহত এক ব্যক্তির হাতের কয়েকটি আঙুল বিস্ফোরণে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, বিভিন্ন শহরের মিছিল থেকে কিছু ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী’ আলাদা হয়ে সহিংসতা চালানোর চেষ্টা করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশটির বিভিন্ন শহরের রাস্তায় ৭০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তার আশঙ্কায় বহু দোকানের সামনে সুরক্ষাব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং বেশ কয়েকটি জাদুঘর বন্ধ রাখা হয়।

গত সপ্তাহের বিক্ষোভে দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতার পর সরকার এবার বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা করছিল। গত শনিবারের সহিংসতায় সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া, শত শত দোকান ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সে সময় দেশজুড়ে অন্তত ২ হাজার ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভের আরেকটি কারণ হলো, সরকারের অনুমোদনহীন বলে বিবেচিত কিছু বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা এবং প্রতিবাদকারীদের শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত। আন্দোলনকারীদের একাংশের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপ তাদের গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার সীমিত করছে।

প্যারিসের এক বিক্ষোভকারী ৪৩ বছর বয়সী নাদেজে বলেন, আগের সপ্তাহে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিয়ে তিনি কাঁদানে গ্যাসের শিকার হয়েছিলেন। এরপরও তিনি আবার রাস্তায় নেমেছেন, কারণ তার মতে, প্রতিবাদ করার অধিকার রক্ষা করা জরুরি। এক শিক্ষার্থীও অভিযোগ করেন, ফ্রান্সে মানুষের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বামপন্থী রাজনীতিক জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবির প্রতি সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, সরকার দাবি উপেক্ষা করলে বিক্ষোভ প্রতি সপ্তাহেই ফিরে আসতে পারে।

গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি স্কুলশিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই ফ্রান্সে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়েছে। ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসংকট, ছাদ চুইয়ে পানি পড়া, ভেঙে পড়া ভবন এবং অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর কারণে শ্রেণিকক্ষে বসার জায়গার অভাবের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করে। পরে শিক্ষক, অভিভাবক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়।

এদিকে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়ছে। ওরলেয়াঁ শহরে কট্টর ডানপন্থী অভিবাসনবিরোধী ন্যাশনাল র‍্যালি দলের সম্মেলনের বিরুদ্ধে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। দলটির নেত্রী মেরিন লে পেন ও ম্যাক্রোঁর সমালোচনা করে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যাক্রোঁর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এই আন্দোলন ফরাসি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ অব্যাহত থাকলে দেশটিতে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এমকে

আরো পড়ুন

সীমান্তে ৩ ইসরায়েলি সেনা, ১ মিশরীয় নিরাপত্তা রক্ষী নিহত

নাগরিকদের লেবানন ছাড়ার আহ্বান যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের

অস্থিরতার ছায়ায় ২০২৬ঃ দক্ষিণ এশিয়ায় নির্বাচন, সংঘাত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির বছর