7 C
London
October 24, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সাথে হাত মিলানোর অপেক্ষায় ভারতঃ নভেম্বরে দিল্লি সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। আগামী নভেম্বর মাসে নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হতে পারে। তবে সফরের নির্দিষ্ট তারিখ ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দুই দেশের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকের জন্য উপযুক্ত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা ও দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য এই সফর সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সম্পর্কের উন্নতি নির্ভর করবে বৈঠকের পর বাস্তব ক্ষেত্রে কী ধরনের অগ্রগতি হয়, তার ওপর।

দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফেরেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা।

দেশে ফেরার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং জনগণের প্রত্যাশার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন তারেক রহমান। দেশে ফেরার কয়েক দিনের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। তার জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। নতুন সরকারের সামনে রাজনৈতিক বিভাজন কমানো, অর্থনীতির চাপ মোকাবিলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রাথমিক ইঙ্গিত দেখা যায়। তার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো শোকবার্তা তার হাতে তুলে দেন।

অন্যদিকে, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগকে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং টেলিফোনে কথা বলেন। মোদি এক বার্তায় জানান, ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে থাকবে। দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার এবং অভিন্ন উন্নয়ন লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।

তবে এসব যোগাযোগের মাধ্যমে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান হয়ে গেছে, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং পারস্পরিক স্বার্থ ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিএনপির নির্বাচনী বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তারেক রহমান ও বিএনপিকে অভিনন্দন জানিয়ে আঞ্চলিক সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা জোরদারে সহযোগিতার কথা বলেন। চীনও বাংলাদেশের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করে।

বাংলাদেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করাও জরুরি।

ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রতি নয়াদিল্লির মনোযোগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নয়াদিল্লিতে পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে ভারতের আনুষ্ঠানিক সম্মতি পাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। তিনি এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হবেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রিয়াজ হামিদুল্লাহ জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

একজন কর্মরত পররাষ্ট্রসচিবকে ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত আসাদ আলম সিয়ামের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের সময় নিশ্চিত হয়নি।

সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য ভারতের আমন্ত্রণ খোলা রয়েছে এবং সফর আয়োজনের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। সফরের জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, যোগাযোগব্যবস্থা, ভিসা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি। অন্যদিকে, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের অবস্থান ও প্রত্যাশার মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানও দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক—উভয় ক্ষেত্রেই বিষয়টি গুরুত্ব বহন করছে।

এসব বিষয় এড়িয়ে গিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নাও হতে পারে। বরং পারস্পরিক উদ্বেগ স্বীকার করে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পানি ও বাণিজ্যসংক্রান্ত স্বার্থের পাশাপাশি ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

বাংলাদেশের সব ধর্মের মানুষের সমান নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্ব বহন করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০ অক্টোবর রংপুরের রাধাগোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরে শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

সেখানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকারভুক্ত দেশ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের ঐক্যের কথাও স্মরণ করেন তিনি।

তার এই বক্তব্যকে জাতীয় ঐক্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতির পক্ষে একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সমান নাগরিক অধিকার এবং আইনের সমান প্রয়োগ বাস্তবে কতটা নিশ্চিত হয়, তার ওপর এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে আস্থা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ ও সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর করতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত হলে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি এবং জনগণের যাতায়াতের ক্ষেত্রে উভয় দেশই সুবিধা পেতে পারে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমাতে এবং আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ সহজ করতে পারে। জ্বালানি সহযোগিতা শিল্প ও গৃহস্থালি পর্যায়ে সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য ভিসাব্যবস্থা শিক্ষার্থী, রোগী, পর্যটক এবং ব্যবসায়ীদের যাতায়াত সহজ করতে পারে। একইভাবে, বাণিজ্যের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া গেলে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক সুবিধার ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি। দুই দেশের স্বার্থ, উদ্বেগ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। সফরটি নভেম্বরে হতে পারে বলে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা থাকলেও দুই সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া নির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিত নয়। প্রস্তুতির প্রয়োজনে সফরের সময়সূচি পরিবর্তিতও হতে পারে।

দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য বৈঠক কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও শুধু আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ বা করমর্দন দিয়ে সম্পর্কের সাফল্য পরিমাপ করা যাবে না। তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, ভিসা ও নিরাপত্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি কতটা হয়, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা।

বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে নতুন করে পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে নিয়মিত সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং দুই দেশের মানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে। সম্ভাব্য দিল্লি সফর সেই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে, তবে সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আলোচনার পর গৃহীত সিদ্ধান্ত ও বাস্তব পদক্ষেপের ওপর।

সূত্রঃ ইন্ডিয়া এম্পায়ার

এমকে

আরো পড়ুন

দেশে ধর্ষণ মামলায় প্রথম মৃত্যুদণ্ডাদেশ

অনলাইন ডেস্ক

ইতালীর রোমে কনটেন্ট ক্রিয়েটর বনি আমিনকে বেধড়ক পেটালো প্রবাসী বাংলাদেশীরা

‘হায় মুজিব হায় মুজিব’ মাতম তোলা সেই আ.লীগ নেতা গ্রেফতার