18.7 C
London
June 14, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য যুক্তরাজ্যের নতুন ভিসা অফারঃ দেবে ৫ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত সহায়তা

যুক্তরাজ্যকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে উচ্চ দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগে বিশেষ ভিসা সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। চ্যান্সেলর র‍্যাচেল রিভস এবং ব্যবসা ও বাণিজ্য সচিব পিটার কাইল যৌথভাবে এ উদ্যোগের ঘোষণা দেন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর লক্ষ্য হলো দ্রুত বর্ধনশীল ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখা এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের প্রথম “ট্রিলিয়ন ডলার” কোম্পানি গড়ে তোলা।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, যোগ্য কোম্পানিগুলো বিদেশ থেকে দক্ষ কর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাজ্যে আনার ক্ষেত্রে ভিসা-সংক্রান্ত ব্যয়ের জন্য কর্মীপ্রতি সর্বোচ্চ ৫ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত সরকারি সহায়তা পাবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বছরে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত এই রিফান্ড সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। অর্থাৎ, বছরে পাঁচজন পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ কর্মীর জন্য এই সহায়তা পাওয়া সম্ভব হবে।

তবে এই সুবিধা সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত নয়। এটি কেবলমাত্র ডিজিটাল ও প্রযুক্তি খাত, জীবন বিজ্ঞান এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে কার্যরত উচ্চ প্রবৃদ্ধির কোম্পানিগুলোর জন্য প্রযোজ্য হবে। সরকার জানিয়েছে, বিদ্যমান বাজেট থেকেই “আগে আসলে আগে পাবেন” ভিত্তিতে অনুদান বিতরণ করা হবে।

এছাড়া সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে চালু করা হচ্ছে নতুন “কনসিয়ার্জ সার্ভিস”। এই বিশেষায়িত সেবা ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রক বাধা, অর্থায়ন সংকট বা সরকারি চুক্তি সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত সমাধানে কাজ করবে। সরকারের ভাষায়, নীতিটি হবে—”যেখানে প্রয়োজন সেখানে সর্বোচ্চ সহায়তা, অন্যথায় ব্যবসার পথ থেকে সরে দাঁড়ানো।”

এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে সফল উদ্যোক্তা পেনি ভার্বেকে সরকারের বিশেষ “স্কেল-আপ উপদেষ্টা” হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী এই সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রাখবেন।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে স্পনসর লাইসেন্স অনুমোদন প্রক্রিয়াও দ্রুততর করা হয়েছে। “ইউকে এক্সপ্যানশন ওয়ার্কার” কর্মসূচির আওতায় স্পনসর লাইসেন্সের আবেদন এখন ১০ দিনের মধ্যেই নিষ্পত্তি করা হবে, যেখানে আগে এ প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেত।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের মোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাত্র শূন্য দশমিক আট শতাংশ দ্রুত বর্ধনশীল স্কেল-আপ কোম্পানি হলেও, ২০২৩ সালে এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন পাউন্ডের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে এবং প্রায় ৩৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।

তবে সরকারের এই পদক্ষেপ ব্যাপক সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের দাবি, দেশটি যখন দীর্ঘদিনের মধ্যে সবচেয়ে বড় তরুণ বেকারত্ব সংকটের মুখোমুখি, তখন বিদেশি কর্মী নিয়োগে সরকারি অর্থ ব্যয় করা দেশীয় কর্মীদের প্রতি অবিচার।

‘মিলবার্ন রিভিউ’-এর তথ্যমতে, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ১০ লাখ তরুণ বেকার অথবা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বাইরে অবস্থান করছেন। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন স্নাতকের মধ্যে একজন এ বছর যুক্তরাজ্য ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন।

অভিবাসন নিয়ন্ত্রণবিষয়ক সংগঠন মাইগ্রেশন ওয়াচ ইউকে এবং বিরোধী দলগুলোর নেতারা অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ না করে বিদেশি কর্মীদের পেছনে ভর্তুকি দেওয়া মূলত “পেছনের দরজা দিয়ে সস্তা শ্রমিক আমদানি” করার শামিল।

ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ক্যালাম প্রাইস বলেন, “কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বদলে যুক্তরাজ্যকে সামগ্রিকভাবে উচ্চ দক্ষ কর্মীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করাই অধিকতর কার্যকর হতো।”

অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। চ্যান্সেলর র‍্যাচেল রিভস বলেছেন, এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্রিটিশ কর্মীদের চাকরি কেড়ে নেওয়া নয়; বরং ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাজ্যের অবস্থান শক্তিশালী করা।

তিনি জানান, স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থানে সহায়তার জন্য সরকার ইতোমধ্যেই ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ডের যুব কর্মসংস্থান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, যার আওতায় প্রশিক্ষণ ও শিক্ষানবিশির সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে।

এদিকে অভিবাসন নীতি নিয়ে লেবার পার্টির ভেতরেও মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য বসতি স্থাপনের নিয়ম পূর্ববর্তীভাবে পরিবর্তন করা উচিত হবে না।

বর্তমানে অধিকাংশ অভিবাসী পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে সরকারের বিবেচনায় থাকা নতুন প্রস্তাবে এই সময়সীমা ১০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা ভিসাধারীদের ক্ষেত্রে তা ১৫ বছর এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলদের জন্য ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

রেইনার বলেন, যারা নিয়ম মেনে কর পরিশোধ করছেন, সমাজে অবদান রাখছেন এবং বিশেষ করে সেবাখাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের জন্য মাঝপথে নিয়ম পরিবর্তন করা অন্যায্য এবং “অ-ব্রিটিশ” হবে।

তিনি আরও বলেন, “সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ একটি বিষয়, কিন্তু যারা এখানে জীবন গড়ে তুলেছেন এবং সমাজের অংশ হয়ে উঠেছেন, তাদের প্রতি পূর্ববর্তীভাবে কঠোরতা আরোপ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।”

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্য একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক প্রতিভা আকর্ষণের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দেশীয় কর্মসংস্থান ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে। ফলে নতুন ভিসা সহায়তা কর্মসূচি অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিকভাবে ততটাই বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।

সূত্রঃ পিপুল ম্যানেজমেন্ট

এম.কে

আরো পড়ুন

গাজার শরণার্থী পরিবারকে যুক্তরাজ্যে থাকার অধিকার দেওয়ার রায় ভুল ছিলঃ কিয়ের স্টারমার

স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর কিয়ার স্টারমারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, একের পর এক মন্ত্রীর পদত্যাগ

১২ দেশে হচ্ছে টিউলিপের অর্থপাচারের তদন্ত