TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

বিশেষ সুবিধা নয়, আইনের দৃষ্টিতে সমান আচরণ চান ব্রিটিশ মুসলমানরাঃ সারা খান

যুক্তরাজ্যে সামাজিক সংহতি, উগ্রবাদ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন দেশটির সামাজিক সংহতি ও উগ্রবাদবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডেইম সারা খান। দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ-কে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ব্রিটিশ মুসলমানরা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; তারা শুধু আইনের দৃষ্টিতে অন্য সবার মতো সমান আচরণ প্রত্যাশা করেন। তার মতে, ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কাউকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি কোনো অপরাধ বা অন্যায়কে আড়াল করাও উচিত নয়।

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ব্রিটেন আন্ডার স্ট্রেইন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের সহ-লেখক হিসেবে ডেইম সারা খান জানান, যুক্তরাজ্যের সমাজে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। প্রতিবেদনের জরিপে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ মনে করেন রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে এবং রাজনীতিবিদরা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছেন। একই সঙ্গে একটি উদ্বেগজনক অংশ মনে করে, বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সহিংসতাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। গবেষণার ফলাফল এতটাই বিস্ময়কর ছিল যে গবেষক দল তথ্যগুলো একাধিকবার যাচাই করতে বাধ্য হয়।

সারা খানের মতে, যুক্তরাজ্যের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু সন্ত্রাসবাদ নয়, বরং উগ্রবাদী চিন্তাধারার বিস্তার। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদ শুরু হওয়ার আগেই উগ্র মতাদর্শ সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেই মতাদর্শই পরবর্তীতে সহিংসতার জন্ম দেয়। তার ভাষায়, উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা এবং সামাজিক সম্প্রীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে শুধু রাজনীতিবিদ নয়, শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পেশাজীবীও ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়ছেন। অনেকে গবেষণা প্রকাশ করতে বা মতামত দিতে সাহস পাচ্ছেন না। শিক্ষকরাও বিতর্কিত বিষয় এড়িয়ে চলছেন। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

সাক্ষাৎকারে বহুল আলোচিত ধর্ষণচক্র কেলেঙ্কারির বিষয়েও স্পষ্ট অবস্থান নেন সারা খান। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে পুলিশ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সামাজিক সেবা সংস্থাগুলো ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অপরাধীদের একটি বড় অংশ পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত হওয়ায় জাতিগত উত্তেজনার আশঙ্কায় অনেক প্রতিষ্ঠান যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পিছিয়ে ছিল। তিনি বলেন, কোনো ধর্মীয় বা জাতিগত গোষ্ঠীকে বিব্রত করার ভয়ে অপরাধীদের রক্ষা করা কিংবা ভুক্তভোগীদের অবহেলা করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

নিজেকে একজন ব্রিটিশ মুসলিম হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব অপরাধের সঙ্গে মুসলিম সমাজের কোনো সম্পর্ক নেই এবং অধিকাংশ ব্রিটিশ মুসলমানও এসব ঘটনার তীব্র বিরোধিতা করেন। তবে দুঃখজনকভাবে তাদের কণ্ঠ অনেক সময় উগ্র ও উচ্চস্বরে কথা বলা গোষ্ঠীর কারণে চাপা পড়ে যায়।

ব্যাটলি গ্রামার স্কুলে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনের ঘটনায় এক শিক্ষককে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকতে হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে সারা খান বলেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে রাষ্ট্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। সামাজিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা উচিত ছিল।

উগ্রবাদ দমনে দীর্ঘদিন কাজ করা ডেম সারা খান নিজেও বিভিন্ন সময় প্রাণনাশের হুমকি ও অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। ইসলামপন্থী উগ্রবাদীরা তাকে ধর্মত্যাগী বলে আখ্যা দিয়েছে, আবার কট্টর ডানপন্থীরাও তাকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তবুও তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজে নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনো গণতন্ত্র, সহনশীলতা ও আইনের শাসনের পক্ষেই রয়েছে।

অভিবাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে বহু অভিবাসী সফলভাবে সমাজের সঙ্গে একীভূত হয়েছেন, ভাষা শিখেছেন, কাজ করেছেন এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। তবে বিপুল অভিবাসনের ফলে কিছু এলাকায় সমান্তরাল সমাজও গড়ে উঠেছে, যেখানে অভিন্ন ব্রিটিশ পরিচয়ের পরিবর্তে ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। যদিও তিনি মনে করেন, দেশের সব সমস্যার জন্য শুধু অভিবাসনকে দায়ী করা সঠিক হবে না।

হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদের প্রশংসা করে সারা খান বলেন, তার মধ্যে দেশপ্রেম স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ব্রিটেন তাদের পরিবারকে আশ্রয় ও সুযোগ দিয়েছে, তাই দেশটির প্রতি দায়িত্ববোধ এবং ইতিবাচক অবদান রাখার শিক্ষা তিনি ছোটবেলা থেকেই পেয়েছেন।

 

সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে তিনি বলেন, সব সংকট সত্ত্বেও তিনি যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। তার বিশ্বাস, উগ্রবাদ, রাজনৈতিক ভয়ভীতি ও সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া, আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং বাকস্বাধীনতা ও সামাজিক সংহতি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ব্রিটেন আবারও একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ে সংকটে ব্রিটেনের রাসায়নিক শিল্পঃ বড় বিনিয়োগ ছাড়া টিকে থাকা কঠিন

যুক্তরাজ্যে বিদ্যুৎ অপচয় ঠেকাতে নতুন পরিকল্পনাঃ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন উদ্যোগ

যুক্তরাজ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ট্যাক্সি সেবায় নতুন যুগের সূচনাঃ উদ্বিগ্ন ব্ল্যাক ক্যাব ও প্রাইভেট হায়ার চালকরা