বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে সুইডেন। তবে বিশ্বের অন্যতম সেরা জীবনমান ও সর্বাধিক ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা দেওয়া এই দেশসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশকে একই সঙ্গে বিশ্বের সর্বোচ্চ করের বোঝাও বহন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে এশিয়ায় সিঙ্গাপুর সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের দেশ হলেও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও কম করের কারণে অঞ্চলটির অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে।
গ্লোবাল সিটিজেন সল্যুশনস প্রকাশিত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচকে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রচলিত পাসপোর্ট সূচকের মতো শুধু ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুযোগ নয়, বরং ভ্রমণ সুবিধা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং জীবনমান—এই তিনটি সূচকের সমন্বয়ে বিশ্বের ১৯৭টি দেশ ও অঞ্চলের পাসপোর্ট মূল্যায়ন করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় সুইডেন প্রথম, সুইজারল্যান্ড দ্বিতীয় এবং ফিনল্যান্ড তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে ৯টিই ইউরোপের, আর এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে সিঙ্গাপুর স্থান করে নিয়েছে।
গবেষকদের মতে, ইউরোপের ধনী দেশগুলোর মধ্যে ভ্রমণ সুবিধা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং জীবনমানের ক্ষেত্রে পার্থক্য খুবই কম। ফলে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে ব্যবধানও সামান্য।
তবে শক্তিশালী পাসপোর্টের পাশাপাশি উচ্চ করের বিষয়টিও প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উঠে এসেছে। সুইডেন কর-সহনশীলতার সূচকে ১৯৮তম, ফিনল্যান্ড ১৯৭তম এবং ডেনমার্ক ১৯৫তম অবস্থানে রয়েছে। এসব দেশে কার্যকর করের হার গড়ে ৫৬ থেকে ৫৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বিস্তৃত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যয় মেটাতেই এসব দেশে উচ্চ হারে কর আদায় করা হয়। গবেষকদের ভাষায়, একটি রাষ্ট্র নাগরিকদের যত বেশি সুবিধা দেয়, তত বেশি করও আদায় করে।
তবে ইউরোপে এর ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে এসেছে সুইজারল্যান্ড ও নরওয়ে। এই দুই দেশে তুলনামূলক কম করের পাশাপাশি উন্নত সুশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, শক্তিশালী আইনব্যবস্থা এবং উচ্চ জীবনমান বিদ্যমান। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ডকে বিশ্বের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পাসপোর্টধারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাথাপিছু জাতীয় আয়ের দিক থেকেও সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ড ইউরোপের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের পাসপোর্ট বিশ্বে শক্তিশালী হলেও মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে তারা ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে।
এশিয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় অঞ্চল। একই অঞ্চলে যেমন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী পাসপোর্ট রয়েছে, তেমনি রয়েছে সবচেয়ে দুর্বল পাসপোর্টও।
এশিয়ার মধ্যে সিঙ্গাপুর বিশ্বের ১০ম শক্তিশালী পাসপোর্টের দেশ এবং অঞ্চলটির শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এরপর রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, হংকং এবং দক্ষিণ কোরিয়া।
বিনিয়োগের স্বাধীনতার সূচকে সিঙ্গাপুর বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে হংকং এবং পঞ্চম স্থানে সংযুক্ত আরব আমিরাত। মাথাপিছু জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রেও সিঙ্গাপুর বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে।
করের দিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের সবচেয়ে সুবিধাজনক দেশ হিসেবে উঠে এসেছে। দেশটিতে কার্যকর করের হার প্রায় শূন্য। হংকং ও সিঙ্গাপুরও বিশ্বের সবচেয়ে কর-সাশ্রয়ী অর্থনীতির মধ্যে রয়েছে। গবেষকদের মতে, কম কর এবং শক্তিশালী বিনিয়োগ পরিবেশের এই সমন্বয় আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের কাছে এসব দেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
অন্যদিকে জাপান ভিন্ন অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করছে। শক্তিশালী পাসপোর্ট ও উন্নত জীবনমান থাকা সত্ত্বেও দেশটির কার্যকর করের হার প্রায় ৫৬ শতাংশ, যা নর্ডিক দেশগুলোর সমপর্যায়ের।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের শক্তিশালী পাসপোর্ট তৈরির কোনো একক মডেল নেই। সিঙ্গাপুর কম কর ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির মাধ্যমে এগিয়েছে, আর জাপান উচ্চ কর ও কল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে একই ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে।
এদিকে ১৯৭টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১২৫তম। যদিও দেশটির মোট স্কোর কিছুটা বেড়েছে, তবুও অন্যান্য দেশের দ্রুত অগ্রগতির কারণে অবস্থান আরও নিচে নেমেছে। বর্তমানে ভারতীয় পাসপোর্টধারীরা ২৬টি দেশে ভিসামুক্ত অথবা পৌঁছানোর পর ভিসা পাওয়ার সুবিধা ভোগ করেন।
তালিকার একেবারে নিচে রয়েছে আফগানিস্তান, এরপর ইয়েমেন এবং সিরিয়া। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভিসামুক্ত ভ্রমণের সূচকে সিঙ্গাপুরের স্কোর যেখানে শতভাগ, সেখানে আফগানিস্তানের স্কোর শূন্য—যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যবধানগুলোর একটি।
গবেষকদের মতে, বর্তমানে একটি দেশের পাসপোর্টের শক্তি শুধু কতটি দেশে ভিসামুক্ত প্রবেশ করা যায়, তার ওপর নির্ভর করে না। বিনিয়োগের সুযোগ, করব্যবস্থা, আয়, জীবনমান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও এখন একটি দেশের নাগরিকত্বের মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সূত্রঃ বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
এম.কে

