২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী সময়ে ১০ জন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) সদস্যকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের এক সাবেক দেহরক্ষী।
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি দাবি করেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউল আহসানের নির্দেশে ১০ জন বিডিআর সদস্যকে আটক করা হয় এবং পরে তাদের বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। সাক্ষীর ভাষ্যমতে, নিহতদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
এই অভিযোগ সামনে আসার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে পিলখানা ট্র্যাজেডির পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এবং সেই সময়ের নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন পদক্ষেপ। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) সদর দপ্তরে সংঘটিত বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল অন্যতম ভয়াবহ সামরিক বিদ্রোহ।
বিদ্রোহের পর হাজার হাজার বিডিআর সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং অধিকারকর্মীরা সে সময় অভিযোগ করেছিলেন যে, আটক সদস্যদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং হেফাজতে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সরকারিভাবে এসব অভিযোগের অনেকগুলো অস্বীকার করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষ্যে সাবেক দেহরক্ষী দাবি করেন, আটক ১০ সদস্যকে রাজধানীর বাইরে না নিয়ে সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত পক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
জিয়াউল আহসান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গনে বহুল আলোচিত একটি নাম। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর তাকে ঘিরে গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার একাধিক অভিযোগ তদন্তের আওতায় আসে। বিভিন্ন মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্য যদি স্বাধীনভাবে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে পিলখানা-পরবর্তী নিরাপত্তা অভিযান ও আটক ব্যক্তিদের ভাগ্য সম্পর্কে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন মাত্রা পাবে।
এদিকে মানবাধিকারকর্মীরা ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, সম্ভাব্য গণকবর বা গোপন সমাধিস্থলের অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তির জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিদ্রোহ-পরবর্তী সময়ে সংঘটিত সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, আগামী শুনানিগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নতুন সাক্ষ্য সামনে আসতে পারে, যা পিলখানা-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নতুন আলোকপাত করবে।
সূত্রঃ সেন্ট্রিস্ট নেশন টিভি
এম.কে

