20.6 C
London
June 12, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

বেলফাস্ট হামলার পর নতুন বিতর্কঃ যুক্তরাজ্য-আয়ারল্যান্ড সীমান্ত ব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ

যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উন্মুক্ত ভ্রমণব্যবস্থা বা কমন ট্রাভেল এরিয়া (সিটিএ) নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আয়ারল্যান্ড সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে আশ্রয়ের আবেদনকারী ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্থলসীমান্ত ব্যবহার করে প্রবেশ করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ডাবলিনের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগের (ডিএফএটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আয়ারল্যান্ডে মোট ১৮ হাজার ৫০০ জন আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বা আশ্রয়ের আবেদন করেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ আবেদনকারী বিমানবন্দর বা সমুদ্রবন্দর দিয়ে সরাসরি আবেদন না করে ডাবলিনের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা কার্যালয়ে সরাসরি উপস্থিত হয়ে আবেদন করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এদের উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্তরাজ্য থেকে বেলফাস্ট হয়ে আয়ারল্যান্ডে প্রবেশ করেছেন।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত এক বছরে উত্তর আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের উন্মুক্ত সীমান্ত অপব্যবহারের অভিযোগে ৯০০ জনের বেশি অভিবাসন আইন লঙ্ঘনকারীকে আটক করা হয়েছে। এতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বেলফাস্টে সংঘটিত একটি ছুরিকাঘাতের ঘটনার পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। সুদানি নাগরিক হাদি আলোদিদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনার পর জানা যায়, তিনি সুদান থেকে প্যারিস হয়ে ডাবলিনে যান এবং সেখান থেকে বাসযোগে বেলফাস্টে পৌঁছে ২০২৩ সালে আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। এই তথ্য প্রকাশের পর বেলফাস্টে দুই রাত ধরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্রিটেন থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯ সালের আগে আয়ারল্যান্ডে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ হাজার। তবে ২০২২ সালের পর থেকে এ সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে এবং ২০২৪ সালে তা ১৮ হাজার ৫০০-তে পৌঁছায়। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালেও একই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি দুই বছরেও যথাক্রমে ৮৮ ও ৯০ শতাংশ আবেদনকারী সরাসরি আন্তর্জাতিক সুরক্ষা কার্যালয়ে গিয়ে আবেদন করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়ারল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার সীমান্তে কোনো নিয়মিত শারীরিক তল্লাশি না থাকায় সীমান্ত অতিক্রমকারীদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে আয়ারল্যান্ডের সাবেক বিচারমন্ত্রী হেলেন ম্যাকএন্টি গত বছর দাবি করেছিলেন, আশ্রয়প্রার্থীদের প্রায় ৮০ শতাংশ স্থলসীমান্ত ব্যবহার করে দেশটিতে প্রবেশ করছে।

এদিকে, বেলফাস্টের সাম্প্রতিক সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আয়ারল্যান্ড সরকার। ডিএফএটি জানিয়েছে, কমন ট্রাভেল এরিয়ার অপব্যবহার রোধে তারা ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে ব্রেক্সিট-পরবর্তী প্রত্যাবাসন চুক্তি পুনরায় কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

২০২০ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যাবাসন চুক্তি দীর্ঘদিন স্থগিত ছিল। কারণ, আয়ারল্যান্ডের উচ্চ আদালত রায় দিয়েছিল যে আশ্রয়প্রার্থীদের রুয়ান্ডায় পাঠানোর যুক্তরাজ্যের নীতির কারণে দেশটিকে আইনগতভাবে “নিরাপদ তৃতীয় দেশ” হিসেবে বিবেচনা করা সম্ভব নয়। তবে যুক্তরাজ্যকে পুনরায় নিরাপদ তৃতীয় দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে চুক্তিটি আবারও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

উত্তর আয়ারল্যান্ডবিষয়ক ব্রিটিশ মন্ত্রী হিলারি বেন, আয়ারল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী জিম ও’ক্যালাহান এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী নাওমি লং সীমান্ত নিরাপত্তা ও সিটিএ রক্ষায় যৌথ পদক্ষেপের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন।

এদিকে, উত্তর আয়ারল্যান্ডের উপপ্রথমমন্ত্রী এমা লিটল-পেঙ্গেলি অভিবাসন নীতি এবং ডাবলিনে সীমান্ত তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির নেতা গ্যাভিন রবিনসন আরও একধাপ এগিয়ে সীমান্ত বন্ধের দাবিও জানিয়েছেন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি উত্তর আয়ারল্যান্ডে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্যাটি হেওয়ার্ডের মতে, ব্রেক্সিটের পর এই ইস্যু আরও জটিল ও আবেগঘন হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক নেতাদের একদিকে জনমতের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে শান্তি চুক্তির বাস্তবতা ও দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতাও বজায় রাখতে হচ্ছে।

আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন বলেছেন, কমন ট্রাভেল এরিয়া আইরিশ ও ব্রিটিশ জনগণের জন্য ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, কিছু ব্যক্তি এই ব্যবস্থার অপব্যবহারের চেষ্টা করবে এবং তাই এটি কার্যকরভাবে পরিচালনা ও তদারকি করা জরুরি।

সীমান্ত নিরাপত্তা, আশ্রয়নীতি এবং দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা এখন যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড উভয় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই ইস্যু দুই দেশের রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হতে পারে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে পূর্ব লিসেস্টারের বিশৃঙ্খলা, গ্রেফতার ২

অনলাইন ডেস্ক

স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ, রাত ৯টার আগে জাঙ্ক ফুডের বিজ্ঞাপন প্রচার নিষিদ্ধ হচ্ছে যুক্তরাজ্যে

ভবিষ্যতে সংসদ মুসলিম এমপিতে ভরে যাবে, যা ভীতিকর—রিফর্ম মেয়র প্রার্থী ক্রিস প্যারি