যুক্তরাজ্যের লেবার সরকারের বেসরকারি স্কুলের ফি-এর ওপর ২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্তকে ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে অতিরিক্ত অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব হবে। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এই নীতির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সেইসব মধ্যবিত্ত পরিবার, যারা দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও ত্যাগের মাধ্যমে সন্তানদের বেসরকারি শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বেসরকারি স্কুলের শিক্ষাসেবা ও বোর্ডিং ফি-এর ওপর ২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে অনেক স্কুল অভিভাবকদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। বিভিন্ন স্কুলে বার্ষিক ফি কয়েক হাজার পাউন্ড পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
শিক্ষাখাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নতুন করব্যবস্থা চালুর মাত্র ১৮ মাসের মধ্যেই অন্তত ৪৭টি বেসরকারি স্কুল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। একই সময়ে সরকারি পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষার্থী এই খাত ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৪৩ হাজার শিক্ষার্থী বেসরকারি স্কুল থেকে সরে গেছে বা অন্য বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।
অভিভাবকদের একটি বড় অংশ বলছেন, ধনী পরিবারগুলোর জন্য অতিরিক্ত ফি পরিশোধ করা তুলনামূলক সহজ হলেও মধ্যবিত্তদের জন্য তা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার সন্তানদের বেসরকারি স্কুল থেকে সরিয়ে সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের পাশাপাশি তাদের শিক্ষাজীবনেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, লেবার সরকার এই নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলছে, যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ শিক্ষার্থী রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর-সুবিধা প্রত্যাহার করে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি স্কুল ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে হাজার হাজার নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।
তবে স্বাধীন স্কুল খাতের প্রতিনিধিরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নীতিটি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা মনে করেন, বেসরকারি স্কুল থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সরকারি খাতে চলে আসলে রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়গুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি আকারের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্ক কেবল করনীতি নিয়ে নয়; বরং এটি যুক্তরাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা, সুযোগ এবং সামাজিক গতিশীলতার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। কেউ এই নীতিকে সামাজিক ন্যায়বিচারের পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন—ধনীদের নয়, বরং উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর স্বপ্নকেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে এই সিদ্ধান্ত।
ফলে বেসরকারি শিক্ষার ওপর ভ্যাট আরোপের এই নীতি এখন যুক্তরাজ্যের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে এর প্রকৃত প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করবে শিক্ষার্থী স্থানান্তর, স্কুলগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং সরকারের প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।
সূত্রঃ গভ ডট ইউকে
এম.কে

