15.3 C
London
August 22, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

ব্রহ্মপুত্রের পলিতে মূল্যবান বিরল খনিজঃ বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্র

বাংলাদেশের নদী ও বদ্বীপের পলিতে বিরল মৃত্তিকা মৌল বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টের উপস্থিতি দেশের অর্থনীতি ও উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ, ব্রহ্মপুত্র-যমুনার চর ও প্লাবনভূমি এবং কক্সবাজার-টেকনাফ-মহেশখালীর সৈকতবালিতে একাধিক মূল্যবান বিরল মৃত্তিকা মৌলবাহী খনিজের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণায় ল্যান্থানাম, সেরিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, নিওডিমিয়াম, সামারিয়াম, গ্যাডোলিনিয়াম, টার্বিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, হলমিয়াম ও আর্বিয়ামের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব মৌলের প্রধান বাহক হিসেবে মোনাজাইট এবং অল্প পরিমাণে জেনোটাইম শনাক্ত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পলিতে বিপুল পরিমাণ কোয়ার্টজও পাওয়া গেছে।

বিরল মৃত্তিকা মৌল বর্তমান বিশ্বের উচ্চপ্রযুক্তি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন, শক্তিশালী চুম্বক, স্মার্টফোন, এলইডি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, রোবট, ড্রোন, মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে এসব মৌলের ব্যবহার রয়েছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশে শনাক্ত হওয়া নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়াম শক্তিশালী স্থায়ী চুম্বক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এসব চুম্বক বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন, রোবট, ড্রোন ও বিভিন্ন শিল্পযন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়াম উচ্চ তাপমাত্রায় চুম্বকের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। টার্বিয়ামের ব্যবহার এলইডি, প্রদর্শন প্রযুক্তি ও সেন্সরেও রয়েছে।

অন্যদিকে ল্যান্থানাম ব্যাটারি, বিশেষ কাচ, ক্যামেরার লেন্স ও তেল পরিশোধনের অনুঘটক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। সেরিয়াম গাড়ির দূষণ নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্র, কাচ পালিশ এবং ইলেকট্রনিক চিপের বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। সামারিয়াম উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল চুম্বক, উড়োজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়।

গ্যাডোলিনিয়ামের ব্যবহার রয়েছে এমআরআই, পারমাণবিক চুল্লি ও বিশেষ ইলেকট্রনিক যন্ত্রে। হলমিয়াম চিকিৎসা প্রযুক্তির লেজারে এবং আর্বিয়াম ফাইবার অপটিক যোগাযোগব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়। জেনোটাইমে থাকা ইট্রিয়ামও এলইডি, লেজার, তাপসহনশীল সিরামিক ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ।

চলতি বছর প্রকাশিত দুটি গবেষণায় বাংলাদেশের এসব সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে এসেছে। একটি গবেষণায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপে বিরল মৃত্তিকা মৌলের বিস্তৃতি, উত্তোলন ও পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াকরণের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। অন্য গবেষণায় ব্রহ্মপুত্র নদের বাংলাদেশ অংশের ২০টি স্থান থেকে সংগৃহীত পলির নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণা অনুযায়ী, বদ্বীপের পলিতে বিরল মৃত্তিকা মৌলের সম্মিলিত ঘনত্ব প্রতি গ্রামে ৪০ দশমিক ৮৯ থেকে ৪৭২ দশমিক ৩৮ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে। বিভিন্ন এলাকায় ভারী খনিজের পরিমাণ ১ থেকে ৩০ শতাংশ এবং এসব ভারী খনিজের মধ্যে বিরল মৃত্তিকা মৌলবাহী খনিজের অংশ প্রায় ৫ থেকে ১৫ শতাংশ।

প্রাথমিক গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বদ্বীপ এলাকায় সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ হাজার টন ভারী বিরল মৃত্তিকা মৌল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি সম্ভাব্য হিসাব; কোথায় কত পরিমাণে কোন মৌল রয়েছে এবং তার কতটুকু অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য—এখনো তা নিশ্চিত নয়।

ব্রহ্মপুত্রের ২০টি নমুনায় সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে সেরিয়াম। পাশাপাশি ল্যান্থানাম, নিওডিমিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, সামারিয়াম, গ্যাডোলিনিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, আর্বিয়াম, হলমিয়াম ও টার্বিয়ামের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে। এসব নমুনায় মোনাজাইট, ইলমেনাইট, গারনেট, জিরকন, রুটাইল, সিলিমানাইট, কায়ানাইট, এপিডোট ও ম্যাগনেটাইটসহ বিভিন্ন খনিজও পাওয়া গেছে।

তবে গবেষণায় এসব খনিজের মোট মজুদের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে বাংলাদেশ এখনই বাণিজ্যিকভাবে রেয়ার আর্থ উত্তোলন করতে পারবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন আরও বিস্তৃত ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পলিতে রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট কত পরিমাণে রয়েছে এবং তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য কি না। অনুসন্ধানের মাধ্যমে কত পরিমাণ বালি প্রক্রিয়া করে কতটুকু মোনাজাইট ও বিরল মৃত্তিকা মৌল পাওয়া যায়, সেটি নির্ধারণ করতে হবে।

তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রিতভাবে বালি থেকে উচ্চমূল্যের খনিজ আলাদা করা গেলে তা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তবে উত্তোলনের খরচ ও বাজারমূল্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।

ব্রহ্মপুত্রের পলিতে পাওয়া কোয়ার্টজও সম্ভাবনার আরেকটি ক্ষেত্র। যদিও কোয়ার্টজ নিজে বিরল মৃত্তিকা মৌল নয়, অত্যন্ত উচ্চ বিশুদ্ধতার কোয়ার্টজ থেকে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী সিলিকন তৈরি করা সম্ভব। তবে বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্রের কোয়ার্টজ সেই মানের কি না, তা এখনো পরীক্ষিত হয়নি।

বিশ্ববাজারে রেয়ার আর্থের গুরুত্বও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার টন বিরল মৃত্তিকা মৌল উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে চীন একাই উৎপাদন করেছে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টন, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ। একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতার প্রায় ৮৫ শতাংশও চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

চীনের এই আধিপত্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ বিকল্প উৎস ও নিজস্ব প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। আগামী দশকগুলোতে বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের বিস্তারের সঙ্গে রেয়ার আর্থের চাহিদা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে যদি অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য মজুদ নিশ্চিত হয়, তাহলে দেশটি শুধু নিজেদের উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের কাঁচামালের উৎসই তৈরি করতে পারবে না, ভবিষ্যতে রফতানি ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিতে পারে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে বড় পরিবেশগত ঝুঁকি। মোনাজাইটের সঙ্গে সাধারণত তেজস্ক্রিয় থোরিয়াম ও ইউরেনিয়াম থাকতে পারে। প্রচলিত অ্যাসিডনির্ভর প্রক্রিয়ায় মোনাজাইট পৃথক করার সময় তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, অ্যাসিডযুক্ত পানি ও ভারী ধাতুদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এ কারণে নদীর চর ও উপকূলীয় বালি থেকে খনিজ উত্তোলনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। নদীর গতিপথ, জীববৈচিত্র্য, কৃষিজমি, মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার ওপর যাতে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। গবেষকেরা পরিবেশবান্ধব হাইড্রোমেটালার্জি, বায়োলিচিং ও ডিপ ইউটেকটিক সলভেন্টের মতো প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার পরামর্শ দিয়েছেন।

ইনস্টিটিউট অব মাইনিং, মিনারেলজি অ্যান্ড মেটালার্জির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও পরিচালক ড. মো. আমিনুর রহমান মনে করেন, এসব খনিজ উত্তোলনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। দেশে এখনো এ ধরনের খনিজের বাজার ও চাহিদা তৈরি না হওয়ায় বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।

ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের পরিচালক (ভূতত্ত্ব) মোহাম্মদ আশরাফুল কামাল জানিয়েছেন, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ ও ব্রহ্মপুত্রের পলিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বালিতে কী ধরনের খনিজ সম্পদ রয়েছে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। গবেষণা শেষ হলে কোথায় কোন খনিজ কী পরিমাণে রয়েছে এবং সেগুলো উত্তোলন ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের নদীর পলিতে রেয়ার আর্থের সন্ধান নিঃসন্দেহে বড় সম্ভাবনার খবর হলেও এখনই এটিকে নিশ্চিত অর্থনৈতিক মজুদ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান, মজুদ নির্ধারণ, অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং পরিবেশবান্ধব উত্তোলন প্রযুক্তি নিশ্চিত করা গেলে এই সম্ভাব্য খনিজ সম্পদ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হতে পারে।

সূত্রঃ আমাদের সময়

এম.কে

আরো পড়ুন

বাবা মুুক্তিযোদ্ধা না হলেও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নিয়েছেন ডিবি হারুন

শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ

কি অবস্থায় আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি