19.1 C
London
September 28, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনের আবাসিক সড়কে ২০ মাইল গতিসীমা চালুর সম্ভবনাঃ ব্যবসার খরচ নিয়ে উদ্বেগ

ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর ও কাউন্সিল আবাসিক সড়কে ঘণ্টায় ২০ মাইল গতিসীমা চালুর উদ্যোগ বাড়াচ্ছে। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, কম গতিতে যানবাহন চলাচল করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমানো সম্ভব এবং স্থানীয় এলাকাগুলো আরও নিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। তবে সমালোচকদের দাবি, এতে যাতায়াতে অতিরিক্ত সময় লাগছে, ব্যবসার খরচ বাড়ছে এবং চালকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।

ওয়েলসে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অধিকাংশ ‘রেস্ট্রিক্টেড রোডে’ ডিফল্ট গতিসীমা ঘণ্টায় ২০ মাইল করা হয়েছে। স্কটল্যান্ডে এডিনবরা শহরজুড়ে ২০ মাইল গতিসীমার নেটওয়ার্ক চালু করা প্রথম শহর। ইংল্যান্ডেও এই ধরনের গতিসীমা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। গ্রেট ব্রিটেনের শহরাঞ্চলের ৩০ শতাংশের বেশি সড়কে এখন ২০ মাইল গতিসীমা রয়েছে।

তবে দেশজুড়ে এর বাস্তবায়ন একরকম নয়। লন্ডন এবং উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের কিছু এলাকায় কম গতিসীমার ব্যবহার বেশি হলেও ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস, ইস্ট মিডল্যান্ডস এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের কিছু এলাকায় এর বিস্তার তুলনামূলকভাবে সীমিত।

বার্মিংহাম সম্প্রতি এ-রোড ছাড়া সব সড়কে ২০ মাইল গতিসীমা চালুর পরিকল্পনা করে আলোচনায় এসেছে। পরিকল্পনাটির বিরোধীরা এটিকে ‘গাড়ির বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে সমালোচনা করেছেন। কভেন্ট্রি সিটি কাউন্সিলও কম গতিসীমা আরও বিস্তৃতভাবে চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে। লেস্টারশায়ার কাউন্টি কাউন্সিল একই ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যা স্থানীয় বাসিন্দা ও কাউন্সিলরদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি করেছে।

২০ মাইল গতিসীমার সমর্থকেরা বলছেন, এর ফলে সড়ক নিরাপত্তায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রিস্টলে ২০ মাইল গতিসীমা চালুর পর যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় ২ দশমিক ৭ মাইল কমেছিল। ওয়েলশ সরকারও ২০ মাইল গতিসীমা চালুর পর যানবাহনের গতি কমার কথা জানিয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ২০’স প্লেন্টি ফর আসের পরিচালক সু নিকোলস বলেছেন, কম গতিসীমা শুধু সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমাতে পারে না, দুর্ঘটনা ঘটলে তার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও কমাতে পারে। তার মতে, কম গতিসীমার ফলে যানবাহনের শব্দ কমা, বায়ুর মান উন্নত হওয়া এবং হাঁটা ও সাইকেল চালানোর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির মতো সুবিধাও পাওয়া যেতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটনের ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পানোস জর্জাকিস বলেন, কম গতিতে সংঘর্ষের ক্ষেত্রে আঘাতের মাত্রা কম হওয়ার বিষয়টি পদার্থবিজ্ঞানের দিক থেকে স্পষ্ট। তার ব্যাখ্যায়, ঘণ্টায় ৩০ মাইল গতিতে চলা গাড়ির গতিশক্তি ২০ মাইল গতিতে চলা গাড়ির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তির ওপর আঘাতের মাত্রা বেশি হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রভাব গুরুতর হতে পারে।

অন্যদিকে, কম গতিসীমার সমালোচকেরা বলছেন, এর ফলে অনেক যাত্রায় আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে। বিশেষ করে ডেলিভারি চালক, ড্রাইভিং প্রশিক্ষক এবং সড়ক পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাগুলো এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তারা দাবি করছেন।

ওয়েলসের রেক্সহ্যামের ড্রাইভিং প্রশিক্ষক স্টুয়ার্ট ওয়াকার বলেন, ২০ মাইল গতিসীমা চালুর পর কিছু যাত্রায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি সময় লাগছে। এর ফলে একটি কর্মদিবসে আগের তুলনায় কমসংখ্যক ড্রাইভিং লেসন নেওয়া সম্ভব হচ্ছে বলে তিনি জানান। তার হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ কর্মদিবসে এর প্রভাব সপ্তাহে প্রায় ২০০ পাউন্ড কম আয়ের কারণ হতে পারে।

তবে ২০’স প্লেন্টি ফর আসের দাবি, শহরের থেমে থেমে চলা যানবাহনের ক্ষেত্রে কম গতিতে মসৃণভাবে গাড়ি চালানো জ্বালানি খরচ কমাতে পারে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা কমলে গাড়ির বিমা খরচও কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংগঠনটি মনে করে।

২০ মাইল গতিসীমা নিয়ে জনমতও বিভক্ত। ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে ২০ মাইল গতিসীমা বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কম গতিসীমার কারণে যান চলাচল ধীর হয়ে যানজট বাড়তে পারে।

ব্রিটেনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের গত বছর প্রকাশিত তথ্যেও দেখা গেছে, অনেক চালক ২০ মাইল গতিসীমার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছেন না। স্বাভাবিক যান চলাচল থাকা পর্যবেক্ষণ করা ২০ মাইল গতিসীমার সড়কগুলোর ৭৬ শতাংশ চালক নির্ধারিত সীমার বেশি গতিতে গাড়ি চালিয়েছেন।

বিরোধীদের বক্তব্য, সব ধরনের সড়কে ব্যাপকভাবে ২০ মাইল গতিসীমা চালু না করে যেখানে স্পষ্ট নিরাপত্তাঝুঁকি রয়েছে, সেসব এলাকায় এটি প্রয়োগ করা উচিত। স্টুয়ার্ট ওয়াকারও বলেছেন, স্কুল, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকার মতো নির্দিষ্ট স্থানে ২০ মাইল গতিসীমা কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হতে পারে। তবে যেসব সড়কে গতি কমানোর ফলে নিরাপত্তায় বাস্তব কোনো প্রভাব পড়বে না, সেখানে এই সীমা আরোপের বিরোধিতা করেছেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিতর্ক এখন শুধু ২০ মাইল গতিসীমা কার্যকর করা সম্ভব কি না—এটি নিয়ে নয়; বরং কোন ধরনের সড়কে এটি সবচেয়ে কার্যকর এবং কোথায় ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা উচিত, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

অধ্যাপক পানোস জর্জাকিস বলেছেন, বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে ২০ মাইল গতিসীমা চালুর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে আরও প্রমাণ প্রয়োজন। একই পদ্ধতি সব এলাকার জন্য উপযুক্ত কি না, সেটিও আরও পরীক্ষা করে দেখা দরকার।

ব্রিটেনের আরও কাউন্সিল যখন আবাসিক ও শহরাঞ্চলের সড়কে গতিসীমা কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে, তখন সড়ক নিরাপত্তার সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি যাতায়াতের সময়, ব্যবসার খরচ, যানজট এবং চালকদের ওপর প্রভাব—সবগুলো বিষয়ই আলোচনায় থাকছে।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন পরিকল্পনা কেন্দ্রের হোটেলে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ

ইংল্যান্ডে ১৬ বছরের কিশোর-কিশোরীর নিকাহ সম্পন্ন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইমাম দোষী সাব্যস্ত

ব্রিটেনে ইহুদিবিদ্বেষী হামলাঃ জিহাদ আল-শামি গুলিতে নিহত, আরও তিনজন গ্রেফতার