ব্রিটেনের অন্যতম বৃহৎ সামরিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজকে (এএফসি) ঘিরে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন এবং নারীবিদ্বেষমূলক আচরণের গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অন্তত চারজন সাবেক নারী রিক্রুট অভিযোগ করেছেন, ১৭ বছর বয়সে কলেজটিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় তারা গণধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, গোপনে নজরদারি এবং অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন। তাদের দাবি, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং কলেজটিতে দীর্ঘদিন ধরে যৌন সহিংসতা ও নারীবিদ্বেষের একটি উদ্বেগজনক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
উত্তর ইয়র্কশায়ারের হারোগেটে অবস্থিত আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজ ব্রিটেনের ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী নতুন সেনা রিক্রুটদের সবচেয়ে বড় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৮৮৯ জন রিক্রুট প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, যার মধ্যে অন্তত ৭০ জন নারী।
বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরে কলেজটিকে ঘিরে নর্থ ইয়র্কশায়ার পুলিশ ১৬টি যৌন অপরাধের অভিযোগ পেয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে যৌন নিপীড়ন, গোপনে ভিডিও বা ছবি ধারণ (ভয়্যারিজম) এবং অশালীন আচরণ। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত কলেজটিতে অনুপযুক্ত যৌন আচরণের মোট ১৭৬টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি অভিযোগ ছিল স্থায়ী স্টাফদের বিরুদ্ধে এবং ১৪৪টি ছিল জুনিয়র সৈনিকদের বিরুদ্ধে।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ছদ্মনাম ব্যবহারকারী এক ভুক্তভোগী জানান, মাত্র ১৭ বছর বয়সে সহপাঠী কয়েকজন সৈনিক তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সংঘবদ্ধভাবে যৌন নির্যাতন করে। ঘটনার পর তিনি সেনাবাহিনী ছেড়ে দেন। তার অভিযোগ, পরে একজন প্রশিক্ষকও তাকে নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করেন, যা মানসিকভাবে আরও ভেঙে দেয়।
আরেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, এক সহকর্মী সৈনিক তাকে একটি কক্ষে আটকে যৌন নিপীড়ন করে। অন্য এক নারী রিক্রুটের মা জানান, প্রশিক্ষণ চলাকালে তার মেয়েকে প্রায় প্রতিদিনই যৌন হয়রানির মুখোমুখি হতে হতো। এমনকি ডরমিটরির দরজার তালা নষ্ট থাকায় রাতে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ ঠেকাতে দরজার সামনে অবস্থান করতে হতো। আরেক সাবেক রিক্রুটের অভিযোগ, কিছু প্রশিক্ষক নারী রিক্রুটদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করতেন, তাদের শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে নম্বর দিতেন এবং অনুমতি ছাড়াই ডরমিটরিতে প্রবেশ করতেন।
এদিকে ব্রিটেনে প্রকাশিত প্রথম সরকারি জরিপে দেখা গেছে, গত এক বছরে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত ৬৭ শতাংশ নারী অন্তত একবার কোনো পুরুষ সহকর্মীর অবাঞ্ছিত যৌন আচরণ বা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ফলে সামরিক বাহিনীতে নারী সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত পাঁচ বছরে আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজের একাধিক প্রশিক্ষক যৌন ও শারীরিক সহিংসতার অভিযোগে সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ২০২৩ সালে এক করপোরাল ঘুমন্ত সহকর্মীকে ধর্ষণের দায়ে সাত বছরের বেশি কারাদণ্ড পান। একই বছরে আরেক করপোরাল যৌন নিপীড়নের দায়ে ২০ মাসের সামরিক কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী জানিয়েছে, যৌন নিপীড়ন বা অপরাধমূলক আচরণের কোনো স্থান সশস্ত্র বাহিনীতে নেই। বাহিনীর পক্ষ থেকে এসব অভিযোগকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের সামনে এসে অভিযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং বিচারিক সহায়তা জোরদারে ডিফেন্স সিরিয়াস ক্রাইম কমান্ডসহ একাধিক সংস্কার কার্যক্রম চালুর কথাও জানানো হয়েছে।
বিবিসির অনুসন্ধান প্রকাশের পর ব্রিটেনে অপ্রাপ্তবয়স্ক সেনা রিক্রুটদের নিরাপত্তা, সামরিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার জবাবদিহি এবং যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জোরালো হয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

