15.2 C
London
August 21, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনের রেলব্যবস্থায় নতুন উদ্বেগঃ ২০২৭ সালে আরও ভয়াবহ গরমের প্রস্তুতি

ব্রিটেনের রেলব্যবস্থা আগামী বছর আরও ভয়াবহ আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় ২০২৭ সালে তাপমাত্রাজনিত নতুন রেকর্ড হওয়ার আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টি, ঝড় ও বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। চলতি গ্রীষ্মে তীব্র তাপপ্রবাহে রেল পরিষেবা ইতোমধ্যে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

আগস্টে যুক্তরাজ্যে চলা পঞ্চম তাপপ্রবাহের সময় মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। পরিস্থিতিকে রেলব্যবস্থার জন্য ‘অসাধারণ চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে নেটওয়ার্ক রেল। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে কয়েকটি রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ট্রেনের গতি কমানোর পাশাপাশি সময়সূচিও সীমিত করেছে।

ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শুয়েউ গেং বলেন, ব্রিটেনের রেলব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে অতিরিক্ত গরম আবহাওয়ার জন্য নকশা করা হয়নি। তীব্র গরমে রেললাইন যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তেমনি ওভারহেড বৈদ্যুতিক লাইনেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পুরো রেল পরিচালনব্যবস্থায় পড়তে পারে।

ব্রিটেনের আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরে বিকশিত এল নিনো গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। এর প্রভাবে যুক্তরাজ্যে চলতি শরতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো আবহাওয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যাডাম স্কাইফ জানিয়েছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বাড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে রেল কর্তৃপক্ষকে শুধু গরমের জন্য নয়, একই সঙ্গে অতিবৃষ্টি, ঝড় এবং সম্ভাব্য বন্যার জন্যও প্রস্তুত হতে বলা হয়েছে। সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূপ্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক উইলিয়াম পাওরি মনে করেন, আগামী এক বছরে রেল পরিচালনাকারীদের দীর্ঘস্থায়ী গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার পাশাপাশি আরও তীব্র বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের সম্ভাবনা মাথায় রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিটেনের রেল অবকাঠামোর কিছু অংশ অতীতের সিদ্ধান্তের কারণে এখন বাড়তি ঝুঁকিতে রয়েছে। স্যালিসবারি থেকে এক্সেটার রেলপথের কিছু অংশে একক লাইন ব্যবস্থা এবং মাটির আর্দ্রতার ঘাটতির কারণে রেলপথের মান খারাপ হয়ে যাওয়ায় ট্রেনের গতি কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। এতে স্বাভাবিক সময়সূচি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ক্র্যানফিল্ড স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের সহযোগী অধ্যাপক ইয়োআনিস কলিউসিস বলেন, সম্ভাব্য ভেজা ও ঝড়ো শরৎ-শীত আসার আগেই হাতে থাকা সতর্কতার সময় কাজে লাগাতে হবে। তার পরামর্শ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিষ্কার করা, কালভার্ট পরীক্ষা, মাটির বাঁধ ও ভূমি কাঠামো পর্যবেক্ষণ এবং গাছপালা ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করতে হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ যথেষ্ট নয়। আগামী কয়েক দশকের জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বিবেচনায় নিয়ে রেল অবকাঠামোর নকশা ও সক্ষমতাও পরিবর্তন করতে হবে। একটি পানি নিষ্কাশন নালা পরিষ্কার করলে পরবর্তী ঝড়ের ক্ষতি কমানো যায়, কিন্তু এর ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে নতুনভাবে নকশা করলে দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

অধ্যাপক গেং ব্রিটেনের রেলপথের নকশায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রার সীমা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, স্পেন ও সৌদি আরবের মতো উষ্ণ দেশগুলো কীভাবে উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে রেলব্যবস্থাকে মানিয়ে নিয়েছে, সেখান থেকে ব্রিটেন শিক্ষা নিতে পারে। স্পেনের রেলব্যবস্থা প্রায় শূন্য থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সৌদি আরবের রেলব্যবস্থা প্রায় ১০ থেকে ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।

অন্যদিকে ব্রিটেনের রেলব্যবস্থা সাধারণত প্রায় মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠান্ডা মোকাবিলা করতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে রেলপথকে একই সঙ্গে চরম ঠান্ডা ও অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা মোকাবিলার উপযোগী করে তুলতে হবে।

চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে বড় ধরনের অর্থ বিনিয়োগ করছে নেটওয়ার্ক রেল। ২০২৪ সালে জলবায়ু, ভূমি প্রকৌশল ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় পাঁচ বছরের সম্ভাব্য ব্যয় ২০১৯ সালের বরাদ্দের তুলনায় পাঁচ গুণ বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমানে রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ২৬০ কোটি পাউন্ডের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এই কর্মসূচির আওতায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ভূমি কাঠামো, রেললাইন এবং ওভারহেড বিদ্যুৎব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করতে পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য হলো চরম আবহাওয়ার কারণে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া।

নেটওয়ার্ক রেলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে ব্রিটেনে উষ্ণ ও বৃষ্টিবহুল শীতের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘন ঘন এবং আরও তীব্র চরম আবহাওয়ার সঙ্গে মোকাবিলায় রেলব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো তাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা হলো, এবারের পরিস্থিতি শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। চলতি গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহ, ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়া, গতি কমানো এবং সম্ভাব্য অতিবৃষ্টির ঝুঁকি দেখিয়ে দিচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্রিটেনের রেল অবকাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে পুনর্গঠন করা এখন জরুরি।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রের পর ব্রিটেনেও ভারতীয় ‘বিষাক্ত’ ভারতীয় মশলার বিরুদ্ধে কড়াকড়ি

এক-তৃতীয়াংশ এনএইচএস চিকিৎসক চিকিৎসা দিতে দিতে ক্লান্তঃ সমীক্ষা

ব্রিটিশ নাগরিকের বিমানবন্দরে মলত্যাগের হুমকি