12 C
London
September 21, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

‘ব্রিটেনে আমার কিছুই নেই’: ব্রেক্সিটের পর সুইডেন থেকে বহিষ্কৃত ব্রিটিশ নাগরিক

ব্রেক্সিটের পর সুইডেনে বসবাসের অধিকার নিয়ে প্রায় পাঁচ বছর আইনি লড়াইয়ের পর ৬৫ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ নাগরিককে দেশটি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সুইডেনে তার বাড়ি ও সুইডিশ স্ত্রীকে রেখে মাত্র দুটি ব্যাগ নিয়ে হিথরো বিমানবন্দরে ফিরতে হয়েছে তাকে। ব্রিটেনে তার কোনো বাড়ি, সম্পত্তি বা সন্তান নেই বলে জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।

চার্লস নামে পরিচয় প্রকাশ করা ওই ব্যক্তি ব্রিটেনে সর্বশেষ ২০২২ সালে মাত্র এক সপ্তাহের জন্য এসেছিলেন। এর আগে ২০১৭ সালে সুইডেনে চলে যাওয়ার পর আর দেশে ফেরেননি। তার কোনো সন্তানও নেই। ফলে সুইডেন থেকে ফেরার পর ব্রিটেনে কোথায় থাকবেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তিনি।

হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন চার্লস। তিনি বলেন, “ব্রিটেনে আমার কিছুই নেই, কিছুই নেই।” তার স্ত্রী তার জন্য একটি ব্যাগে কিছু পোশাক গুছিয়ে দিয়েছিলেন। আরেকটি ছোট ব্যাগে ছিল সুইডেনে আটক থাকার সময় ফেরত পাওয়া ব্যক্তিগত সামগ্রী।

চার্লসের দাবি, সুইডেনে প্রায় নয় বছর বসবাসের সময় তিনি দেশটির সমাজের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিছুটা সুইডিশ ভাষা শিখেছেন এবং দেশটির সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন। তার ভাষায়, তিনি কোনো অপরাধ করেননি; তারপরও তাকে একজন অপরাধীর মতো আচরণের শিকার হতে হয়েছে।

সুইডেন থেকে বহিষ্কারের আগে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে যাওয়ার জন্য চার্লস ও তার স্ত্রীকে একটি বার্তা পাঠানো হয়েছিল। তারা ধারণা করেছিলেন, ব্রেক্সিটের আগে সুইডেনে তাদের বৈধভাবে বসবাসের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের মামলার বিষয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর চার্লসকে আটক করা হয় এবং জানানো হয়, তাকে সুইডেন থেকে বহিষ্কার করা হবে।

চার্লস বলেন, তিনি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন যে প্রয়োজন হলে নিজেই ব্রিটেনে চলে যাবেন এবং তাকে আটক করার প্রয়োজন নেই। এমনকি নিজের গাড়িতে করে ব্রিটেনে যাওয়ার অনুমতিও চেয়েছিলেন, যাতে সুইডেনে থাকা নিজের কিছু জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে পারেন। কিন্তু তার দাবি, কর্তৃপক্ষ জানায়, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই নেওয়া হয়েছে।

সুইডেনের একটি আটককেন্দ্রে তাকে দুই সপ্তাহ রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে বের হওয়ার সময় তার হাতে দেওয়া ব্যক্তিগত সামগ্রীর মধ্যে ছিল একটি ছোট টুথপেস্টের টিউব, টুথব্রাশ ও ইয়ারপ্লাগ। সুইডেনের কারাগার ও প্রবেশন সার্ভিসের নাম লেখা একটি প্লাস্টিকের খামের মধ্যে এসব সামগ্রী রাখা ছিল।

ব্রেক্সিটের আগে ব্রিটিশ নাগরিকরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোতে বসবাস, কাজ, পড়াশোনা ও অবসর জীবন কাটানোর অধিকার ভোগ করতেন। যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর যেসব ব্রিটিশ নাগরিক আগে থেকেই অন্য সদস্য রাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন, তাদের অধিকার ব্রেক্সিট প্রত্যাহার চুক্তির মাধ্যমে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়।

তবে সুইডেনে ব্রিটিশ নাগরিকদের কয়েকটি বহিষ্কারের ঘটনায় সেই অধিকার কীভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দ্য গার্ডিয়ান-এর তথ্য অনুযায়ী, ব্রেক্সিটের পর বসবাসের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণে সুইডেন ৪৫৮ জন ব্রিটিশ নাগরিককে বহিষ্কার বা জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়েছে।

ব্রিটিশ নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ব্রিটিশ ইন ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। সংগঠনটির চেয়ার জেন গোল্ডিং বলেন, চার্লসের ঘটনাটি আবারও প্রশ্ন তুলেছে, সুইডেনে ব্রেক্সিট প্রত্যাহার চুক্তি তার মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না।

গোল্ডিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, চার্লসের সুইডেনে পর্যাপ্ত অর্থ, একটি বাড়ি এবং একজন সুইডিশ স্ত্রী রয়েছে। বিপরীতে ব্রিটেনে তার কোনো সম্পত্তি নেই। ফলে সুইডেন থেকে বহিষ্কারের পর তিনি যুক্তরাজ্যে কার্যত গৃহহীন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।

সুইডেনে ব্রিটিশ নাগরিকদের বহিষ্কারের বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির রাজনৈতিক আলোচনাতেও উঠে এসেছে। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে তারা সরকার গঠন করতে পারলে ব্রিটেনে বসবাসকারী সুইডিশ নাগরিক এবং সুইডেনে থাকা ব্রিটিশ নাগরিকদের নিয়ে তৈরি সমস্যার সমাধানে জরুরি আইন প্রণয়ন করবে এবং কিছু ক্ষেত্রে নতুন করে বসবাসের আবেদনের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেবে।

চার্লসের ঘটনা অবশ্য একক কোনো ঘটনা নয়। এর আগে সুইডেনে ২১ বছর ধরে বসবাস করা ৭৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ বিধবা জয়েস থমাসের বিরুদ্ধেও দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে ২৫ বছর ধরে সুইডেনে বসবাস করা ৭৪ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ নাগরিক, যিনি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এবং সার্বক্ষণিক পরিচর্যায় ছিলেন, তাকেও দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া ১০ বছর বয়স থেকে সুইডেনে বসবাস করা ৩৪ বছর বয়সী আরেক ব্রিটিশ নাগরিককে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বহিষ্কার করা হয়।

এসব ঘটনার পর ব্রেক্সিটের আগে থেকেই সুইডেনে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের বিশেষ সুরক্ষা এবং তাদের আবাসিক অধিকার বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ ইন ইউরোপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সম্পাদিত প্রত্যাহার চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল—ব্রেক্সিটের কারণে আগে থেকে বসবাসরত নাগরিকদের জীবন যেন যতটা সম্ভব আগের মতোই চলতে পারে।

চার্লস জানিয়েছেন, সুইডেনে প্রথম যাওয়ার সময় দেশটিকে তার বসবাসের জন্য চমৎকার মনে হয়েছিল। সমুদ্রের কাছাকাছি পরিবেশ, বন, প্রকৃতি এবং সেখানকার মানুষের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলে যায় বলে তিনি দাবি করেন।

হিথরো বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় চার্লসের সামনে ছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। সুইডেনে তার বাড়ি ও স্ত্রী রয়ে গেছেন, আর ব্রিটেনে তার নিজের কোনো বাড়ি বা সম্পত্তি নেই। তার একমাত্র ইচ্ছা হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, স্ত্রী, বাড়ি ও বন্ধুদের কাছে সুইডেনে ফিরে গিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে চান।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান, ব্রিটিশ ইন ইউরোপ

এমকে

আরো পড়ুন

ইংলিশ চ্যানেলে ফরাসি বাধাঃ অভূতপূর্ব সমুদ্র অভিযানে শুরু হচ্ছে মাইগ্রান্ট আটক অভিযান

ক্যান্সারের জন্য পছন্দের সব খাবারই ছাড়লেন ব্রিটিশ রাজা!

বিলেতে বাড়ি কেনাবেচাঃ  স্টুডেন্ট মর্গেজ

নিউজ ডেস্ক