20.5 C
London
September 15, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের অগ্রগতিঃ নতুন প্রজন্মের সাফল্যে বদলে যাচ্ছে পুরোনো চিত্র

ব্রিটেনে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী একসময় অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ব্যাপকভাবে পিছিয়ে থাকা একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু নতুন প্রজন্মের শিক্ষাগত সাফল্য, কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ এবং পেশাগত অগ্রগতির কারণে সেই পুরোনো চিত্র ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট।

প্রতিবেদনটিতে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বসবাসকারী প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশির সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলিম হওয়ায় এটিকে ব্রিটেনের মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো—বর্তমান পরিসংখ্যানের কিছু অংশ বাংলাদেশিদের এখনও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখালেও নতুন প্রজন্মের অগ্রগতি সেই সামগ্রিক চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি ইতিবাচক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব লন্ডনে বসবাস করে আসছে। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন প্রিন্স চার্লস স্পিটালফিল্ডস এলাকা পরিদর্শন করে সেখানে বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রার অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার হার নিয়ে সরকারি পর্যায়েও উদ্বেগ ছিল।

১৯৮৫ সালের একটি সরকারি প্রতিবেদনে বাংলাদেশি শিশুদের শিক্ষাগত অর্জনকে অত্যন্ত নিম্ন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অনেক শিশু গ্রামীণ বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে এসে শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছিল এবং তাদের ইংরেজি ভাষাজ্ঞানও সীমিত ছিল। একই সময়ে বর্ণবাদী হামলার আশঙ্কা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও অনেক পরিবারের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল।

তবে দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রজন্মের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের অগ্রগতি সবচেয়ে স্পষ্ট।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জিসিএসই পরীক্ষায় শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে তাদের সাফল্য আরও বেড়েছে। ২০২১ সালে জিসিএসই দেওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল, যেখানে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩৮ শতাংশ।

শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নয়, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে এবং ভবিষ্যতে ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে—এমন বিষয় বেছে নিচ্ছে।

গত এক দশকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে মেডিসিন ও ডেন্টিস্ট্রিতে পড়াশোনার সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। অতীতে বাংলাদেশি পরিবারের তুলনামূলক কম আয় ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে নারীদের কম কর্মসংস্থানের কথা বলা হতো। কিন্তু ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হচ্ছে।

২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বাংলাদেশি নারীদের ৬৮ শতাংশ কর্মরত ছিলেন। একই বয়সী শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নারীদের ক্ষেত্রে হার ছিল ৭৯ শতাংশ। তবে বাংলাদেশি অভিবাসী নারীদের কর্মসংস্থানের হার অনেক কম—এই বয়সসীমায় তা ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম এবং সদ্য অভিবাসী প্রজন্মের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।

পেশাগত অবস্থানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশিদের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৪ শতাংশ পেশাগত বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের চাকরিতে ছিলেন। এই হার শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের প্রায় সমপর্যায়ের।

শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইংল্যান্ডের স্কুলগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়েছে বলে দ্য ইকোনমিস্ট উল্লেখ করেছে।

তবে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের সমস্যাও এখনও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবাসন ব্যয় বাদ দেওয়ার পর প্রায় প্রতি দুই বাংলাদেশির একজন জাতীয়ভাবে সবচেয়ে নিম্ন আয়ের ২০ শতাংশ পরিবারের মধ্যে পড়ে। বাংলাদেশি পরিবারের মধ্যম সম্পদের পরিমাণও জাতীয় অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক কম।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি বাংলাদেশি পরিবারের মধ্যম সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ ডলারের কম, যেখানে সব জাতিগোষ্ঠী মিলিয়ে গড় সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ডলার। বাংলাদেশিরা এখনও পূর্ব লন্ডনে তুলনামূলকভাবে বেশি কেন্দ্রীভূত। ফলে দারিদ্র্যের পুরোনো চিত্র পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি।

তবে দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ বলছে, শুধু বর্তমান সম্পদ বা আয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনকে পুরোপুরি বোঝা যায় না। কারণ এই জনগোষ্ঠীতে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন অভিবাসী যুক্ত হচ্ছেন। ফলে সামগ্রিক পরিসংখ্যানের মধ্যে নতুন ও অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অভিবাসীদের অন্তর্ভুক্তি পুরোনো প্রজন্মের অগ্রগতিকে আংশিকভাবে আড়াল করতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক ব্রিটেনের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছে। পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের অনুপাত প্রায় একই। ফলে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীতে নতুন অভিবাসীদের প্রবেশ অব্যাহত থাকায় তাদের অর্থনৈতিক একীভূত হওয়ার অগ্রগতি পরিসংখ্যানে তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নাও হতে পারে।

ব্রিটেনের অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও বাংলাদেশিদের তুলনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ উত্তর ইংল্যান্ডের শিল্প-পরবর্তী শহরগুলোতে বসবাস করে। শিক্ষাক্ষেত্রে পাকিস্তানি তরুণরাও শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ছাড়িয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি শিক্ষিত নারীদের সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থানেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

জাতীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক আনিসা বাটের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষিত বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নারীদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা বিয়ের বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—অর্থাৎ উচ্চতর যোগ্যতা তাদের সামাজিক আকর্ষণ বাড়াচ্ছে।

দ্য ইকোনমিস্ট ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের অগ্রগতিকে পূর্ব আফ্রিকা থেকে ১৯৭০-এর দশকে বিতাড়িত এশীয় জনগোষ্ঠী এবং ২০০০-এর দশকে আসা পূর্ব ইউরোপীয় অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তুলনা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো জনগোষ্ঠী যদি দ্রুত হারে অভিবাসন করে পরে অভিবাসনের গতি কমিয়ে দেয়, তাহলে তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে দ্রুত দৃশ্যমান হয়।

বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। কারণ পুরোনো প্রজন্মের পাশাপাশি নতুন অভিবাসীরাও নিয়মিত যুক্ত হচ্ছেন। ফলে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যানে অগ্রগতির গতি তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান হতে পারে।

তবে প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চহারে ভর্তি, পেশাগত চাকরিতে অংশগ্রহণ এবং নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি প্রজন্মের সামাজিক ও অর্থনৈতিক একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া স্পষ্ট হচ্ছে।

সূত্রঃ দ্য ইকোনমিস্ট

এম.কে

আরো পড়ুন

দিনদুপুরে লন্ডনের অভিজাত এলাকায় স্বর্ণের দোকানে দুঃসাহসিক ডাকাতি, ব্যাগ ভরে সোনা লুট

অবৈধ ডেলিভারি রাইডার চিহ্নিত করতে অ্যাসাইলাম হোস্টেলের ঠিকানা দেবে ব্রিটেন সরকার

ইউনিভার্সিটি ও হোম অফিসের অযাচিত সিদ্ধান্তে একজন ছাত্রের করুণ পরিনতি