লন্ডনে শিশুদের একটি অংশ ভয়াবহভাবে জড়িয়ে পড়ছে ব্রিটেনের ‘কাউন্টি লাইনস’ মাদক বাণিজ্যে। সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলো শিশুদের বন্ধুত্ব, অর্থ ও সামাজিক মর্যাদার প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের নেটওয়ার্কে ঢোকানোর পর ভয়ভীতি, সহিংসতা ও জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মাদক, নগদ অর্থ ও অস্ত্র পরিবহনে ব্যবহার করছে। দ্য লন্ডন স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ক্র্যাক কোকেন ও হেরোইন সরবরাহের মাধ্যমে কাউন্টি লাইনস অপরাধব্যবস্থা বছরে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি পাউন্ড আয় করছে।
প্রতিবেদনে ১৪ বছর বয়সী ‘ক্যাসপার’ নামের এক শিশুর ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। লন্ডন থেকে তাকে পাচার করে একটি ‘ট্র্যাপ হাউসে’ আটকে রাখা হয়। সেখানে তাকে হেরোইন ও ক্র্যাক কোকেন পরিবহন ও বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। একাধিকবার নতুন জায়গায় নেওয়ার সময় পুলিশের নজর এড়াতে তার শরীরের ভেতরে মাদক লুকিয়ে রাখতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ। তাকে নিয়মিত মারধর করা হতো এবং পালানোর চেষ্টা করলে তার মাথায় বন্দুক ঠেকানো হতো। তার পরিবারের লন্ডনের বাড়িতেও বারবার ভাঙচুর চালানো হয়।
কাউন্টি লাইনসের কার্যক্রম এখন শুধু এক শহর থেকে অন্য শহরে মাদক সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিশুদের অপরাধমূলক শোষণ, দুর্বল ব্যক্তিদের বাড়ি দখল করে মাদক রাখার ঘাঁটি তৈরি, অর্থপাচার এবং কৃত্রিম ঋণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের মতো অপরাধ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১ বছর বয়সী শিশুকেও মাদক, নগদ অর্থ ও অস্ত্র পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইয়ুথ এনডাওমেন্ট ফান্ডের হিসাবে, ব্রিটেনে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রতি আটজন শিশুর একজনকে মাদক বিক্রি বা পরিবহনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। লন্ডনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ৪ হাজারের বেশি শিশু কাউন্টি লাইনস কার্যক্রমে প্রলুব্ধ বা জোরপূর্বক যুক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেন্ট জাইলস ট্রাস্টের সহযোগী পরিচালক জুনিয়র স্মার্ট বলেন, অপরাধী চক্রগুলো শিশুদের লক্ষ্য করে কারণ তাদের প্রভাবিত, ভয় দেখানো, বিচ্ছিন্ন ও নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলক সহজ। শুরুতে সামান্য অর্থ, দামি জুতা-পোশাক, খাবার কিংবা বন্ধুত্বের মাধ্যমে তাদের কাছে টানা হয়। লন্ডনের দরিদ্র কিছু এলাকায় এমনকি এক বালতি ভাজা মুরগি দিয়েও শিশুদের প্রলুব্ধ করার ঘটনা সামনে এসেছে।
প্রলোভনের পর শুরু হয় শোষণের কঠিন ধাপ। শিশুদের অস্ত্র বহন, প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংয়ের সদস্যদের ওপর হামলা এবং নতুন শহরে মাদক সরবরাহের লাইন তৈরি করার মতো কাজে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে এমন একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে ১৪ বছর বয়সী এক ছেলেকে গ্যাংয়ে দীক্ষার অংশ হিসেবে একটি মেয়েকে ধর্ষণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্যাসপারের ক্ষেত্রে স্কুল থেকে বহিষ্কারও বড় ঝুঁকি তৈরি করে। ১২ বছর বয়সে স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর সে দীর্ঘ সময় শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। তার মা দীর্ঘ সময় কাজ করতেন এবং পরিবারে আর্থিক সংকট ছিল। এতগুলো সতর্কতামূলক লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও সামাজিক সেবা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আরেক কিশোর ‘ইওয়ান’-এর ক্ষেত্রেও ছিল দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং মাদক ব্যবহার। মাত্র ১০ বছর বয়সে সে গাঁজা ব্যবহার শুরু করে এবং ১২ বছর বয়সে নিজের মাদক ব্যবহারের অর্থ জোগাড় করতে কাউন্টি লাইনসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। পরে তার মাদক ব্যবহার বেড়ে যায় এবং সে বারবার নিখোঁজ হতে থাকে।
ব্ল্যাক বক্স রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটেন্সির প্রতিষ্ঠাতা ড. গ্রেস রবিনসন বলেন, তাদের সঙ্গে কাজ করা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের বড় একটি অংশের স্কুল থেকে বহিষ্কার অথবা দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতির ইতিহাস রয়েছে। তার মতে, স্কুল অনেক শিশুর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষামূলক পরিবেশ তৈরি করে। স্কুল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর অপরাধী চক্রগুলোর জন্য ওই শিশুদের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীকে পিউপিল রেফারাল ইউনিটে পাঠানো হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে কম সময়ের ক্লাসসূচির কারণে কিছু শিশু দিনের একটি বড় অংশ তত্ত্বাবধানহীন থাকে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্কুল ফাঁকি, মাদক রাখা বা অস্ত্র বহনের মতো আচরণ অনেক সময় শুধু শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়; এগুলো কোনো শিশু ইতোমধ্যে অপরাধমূলক শোষণের শিকার হওয়ার লক্ষণও হতে পারে।
ক্যাসপারকে তার বাড়ি থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে পুলিশ খুঁজে পেলেও তাকে ন্যাশনাল রেফারাল মেকানিজম বা এনআরএমে রেফার করা হয়নি। মর্ডান স্লেভারি আইনের আওতায় কোনো শিশুকে পাচার বা শোষণের শিকার হওয়ার যৌক্তিক সন্দেহ থাকলে পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি কর্তৃপক্ষের তাকে এনআরএমে রেফার করার আইনি দায়িত্ব রয়েছে।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অভিযোগ, কাউন্টি লাইনসের শিকার অনেক শিশুকেই ভুক্তভোগী হিসেবে না দেখে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের নীরবতা, অসংলগ্ন বক্তব্য কিংবা বারবার গ্যাংয়ের কাছে ফিরে যাওয়াকে কখনো অপরাধমূলক উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। অথচ এগুলো জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক আঘাতের ফলও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশুকে কাউন্টি লাইনস থেকে বের করে আনতে শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি, আস্থাভিত্তিক ও মানসিক আঘাত বিবেচনায় নেওয়া সহায়তা প্রয়োজন। ইওয়ানের ক্ষেত্রে সেন্ট জাইলস তার অটিজম, মানসিক স্বাস্থ্য এবং অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে ধীরে ধীরে তার সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করে।
মেট্রোপলিটন পুলিশ লন্ডনে নিয়মিত মাদক সরবরাহের লাইন বন্ধ করছে। তবে প্রতিবেদনে স্কুলে অনুপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, যুব সেবা, সামাজিক সহায়তা এবং কাউন্সিলগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। সাম্প্রতিক ক্রাইম অ্যান্ড পুলিশিং অ্যাক্ট শিশুদের অপরাধমূলক শোষণসংক্রান্ত অপরাধ আরও শক্তিশালী করলেও বিশেষজ্ঞদের একাংশ পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর শোষণের লক্ষণ শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ড. রবিনসনের মতে, খুব কম ঘটনাই পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পর্যায়ে পৌঁছায়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা শিশুদের শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগেই শোষণের লক্ষণ শনাক্ত করা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানো, যুব ও সামাজিক সহায়তা শক্তিশালী করা এবং অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার পরিবর্তে শিশু সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সূত্রঃ দ্য লন্ডন স্ট্যান্ডার্ড
এম.কে

