ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার। আলোচনার অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যে পড়তে আসা ইইউভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে দেশীয় শিক্ষার্থীদের সমপরিমাণ টিউশন ফি নেওয়ার বিষয়ে তিনি নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছিলেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে বছরে সর্বোচ্চ ৩৮ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত টিউশন ফি প্রদানকারী ইউরোপীয় শিক্ষার্থীরা দেশীয় শিক্ষার্থীদের মতো বছরে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৫৩৫ পাউন্ড ফি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী বছরে প্রায় ২৮ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারবেন।
জানা গেছে, চলতি মাসের শুরুতে ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-ব্যাঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লেয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কোস্তার সঙ্গে পৃথক বৈঠকে স্টারমার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের জন্য দেশীয় হারে টিউশন ফি নিশ্চিত করা ছিল ব্রাসেলসের অন্যতম প্রধান দাবি।
তবে যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়, উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত এই বিষয়টি বৃহত্তর বাণিজ্য ও সহযোগিতা চুক্তিতে অগ্রগতি হলে তবেই আলোচনার অংশ হবে। পরে উভয় পক্ষ ২২ জুলাই বেলজিয়ামে একটি যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণের ঘোষণা দেয়।
এই সম্মেলনে যুব চলাচল কর্মসূচি, খাদ্য, পানীয় ও জ্বালানি খাতে সীমান্ত-বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা কমানোসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সম্মেলনটি স্থগিত করা হয়।
সূত্রগুলো বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আশঙ্কা করেছিল যে নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর পূর্বের সমঝোতা বহাল নাও থাকতে পারে। তবে নতুন নেতৃত্ব এলেও ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের দেশীয় হারে টিউশন ফি প্রদানের দাবি থেকে তারা সরে আসবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাজ্য সরকারের এক মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এসব দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, সরকার ইউরোপের সঙ্গে এমন একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে কাজ করছে যা ব্রিটিশ জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে। তবে চলমান আলোচনা সম্পর্কে সরকার কোনো ধরনের মন্তব্য করবে না বলেও জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব কার্যকর হলে যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে। দেশটির শীর্ষ গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংগঠন রাসেল গ্রুপ আগেই সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের দেশীয় হারে টিউশন ফি নেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয় খাতের বছরে ৫০ কোটি পাউন্ডেরও বেশি রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে।
বর্তমানে ব্রিটিশ শিক্ষার্থীরা স্নাতক পর্যায়ে বছরে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৫৩৫ পাউন্ড টিউশন ফি দেন। ব্রেক্সিটের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিক্ষার্থীরাও একই সুবিধা পেতেন। তবে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করার পর তাদের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে বছরে সর্বোচ্চ ৩৮ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ফি দিতে হচ্ছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাজ্যে অধ্যয়নরত মোট ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৫৬৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থীর প্রায় ১১ শতাংশই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশীয় হারে টিউশন ফি চালু হলে ইউরোপীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনামূলক বেশি ফি প্রদানকারী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংকুচিত হতে পারে।
কিছু নীতিনির্ধারক মনে করছেন, এতে চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যেতে পারে, যা জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে অন্যদিকে ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঋণের পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বর্তমানে ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের ঋণের অর্থ তাদের আয় থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়া হলেও ইউরোপীয় শিক্ষার্থীরা নিজ দেশে ফিরে গেলে সেই ঋণ আদায় করা যুক্তরাজ্যের জন্য তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে ব্রেক্সিট-পরবর্তী সম্পর্ক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে টিউশন ফি নিয়ে সম্ভাব্য এই সমঝোতা একদিকে যেমন যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করতে পারে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা ও শিক্ষাঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

