13 C
London
October 24, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

ভারতের উত্তর প্রদেশে পুলিশের গুলিবর্ষণ নিয়ে অনুসন্ধানঃ আহতদের প্রায় ৯৩ শতাংশ মুসলিম

ভারতের উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক অনুসন্ধানে। ২০২০ সাল থেকে পুলিশের গুলিতে আহত প্রায় ৬৫০ জনের মধ্যে যাদের ধর্মীয় পরিচয় শনাক্ত করা গেছে, তাদের প্রায় ৯৩ শতাংশ মুসলিম। অনুসন্ধানটি পুলিশের বলপ্রয়োগ, ধর্মীয় বৈষম্য এবং এসব ঘটনায় জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা নিয়ে গবেষণা করেছে সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬৫০টি ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করেছে। এপি এর মধ্যে ২০০টিরও বেশি ঘটনা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করেছে। শনাক্ত করা ভুক্তভোগীদের মধ্যে মুসলিমদের উচ্চ অনুপাত উঠে এলেও সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পুলিশের গুলিতে আহত অনেক সন্দেহভাজনের পায়ে, বিশেষ করে হাঁটুর নিচে আঘাত লেগেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহভাজনরা পালানোর চেষ্টা করেছিলেন অথবা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে তারা আহত হন। তবে পুলিশের বর্ণনার সঙ্গে সব ঘটনার বাস্তব পরিস্থিতি মেলে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা।

ফরেনসিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ কালিম খান গুলিবিদ্ধ হওয়ার ধরন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, পায়ের নির্দিষ্ট অংশে গুলি লাগার কিছু ধরন কাছ থেকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার ক্ষত, গুলির গতিপথ এবং অন্যান্য ফরেনসিক প্রমাণ বিশ্লেষণ ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

উত্তর প্রদেশে পুলিশের গুলিতে পায়ে আহত করার এই কৌশল স্থানীয়ভাবে ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ বা ‘অপারেশন লেম’ নামে পরিচিত। মানবাধিকারকর্মী ও সমালোচকদের অভিযোগ, এ ধরনের অভিযান কখনো কখনো বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা তৈরি করছে। তাদের মতে, অপরাধের অভিযোগ থাকলেও অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং পুলিশের বলপ্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা যাচাই করা জরুরি।

২০১৭ সালের মার্চে যোগী আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ৩১৬ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়েছেন। রাজ্য পুলিশের তথ্যের ভিত্তিতে এপি জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ১১০ জন মুসলিম, যা মোট নিহতের প্রায় ৩৪.৮ শতাংশ। একই সময়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ১২ হাজার ৮৯০ জন সন্দেহভাজন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ১৮ জন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ১ হাজার ৯৫৩ জন আহত হয়েছেন।

উত্তর প্রদেশের জনসংখ্যার আনুমানিক এক-পঞ্চমাংশ মুসলিম। সেই তুলনায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত সন্দেহভাজনদের মধ্যে মুসলিমদের অনুপাত বেশি। তবে নিহতদের ধর্মীয় পরিচয়সংক্রান্ত পরিসংখ্যান এবং গরু পাচারের অভিযোগে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের তথ্য এক নয়। আহত সন্দেহভাজনদের ধর্মীয় পরিচয় অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়নি। ফলে এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি ঘটনায় ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিল বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

উত্তর প্রদেশ পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অমিতাভ যশ এপিকে বলেছেন, পুলিশ সদস্যদের আত্মরক্ষার প্রয়োজন হলেই বলপ্রয়োগের নির্দেশনা রয়েছে। সন্দেহভাজনদের পায়ে গুলি করার কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। আহতদের মধ্যে মুসলিমদের অনুপাত বেশি হওয়ার ব্যাখ্যায় তিনি গবাদিপশুর ব্যবসার সঙ্গে মুসলিমদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে, গুলিবর্ষণের ঘটনায় অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করা যেতে পারে বলে জানান তিনি।

এপি ছয়জন গুলিবিদ্ধ মুসলিমের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেছে। প্রতিশোধ বা হয়রানির আশঙ্কায় তারা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের পরিবারের সদস্যরা মহিষের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গুলিতে পা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তারা আগের মতো কাজ করতে পারছেন না বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। এতে পরিবারের আয় কমে গেছে এবং দৈনন্দিন খরচ চালাতে তাদের অন্যের সহায়তা ও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

গরু ভারতে বহু হিন্দুর কাছে ধর্মীয়ভাবে পবিত্র প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে গরু জবাই ও গবাদিপশু পরিবহনের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে গবাদিপশু পরিবহন, পাচার এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের আইন রাজ্যভেদে ভিন্ন হতে পারে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তার অপরাধ প্রমাণিত হয় না; আইন অনুযায়ী অভিযোগের তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন।

এপির অনুসন্ধানে উত্তর প্রদেশের বাইরেও পুলিশের এ ধরনের অভিযান নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, গুলিবর্ষণকে অপরাধ দমনের নিয়মিত পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হলে বিচারিক প্রক্রিয়া ও পুলিশের জবাবদিহি দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে, উত্তর প্রদেশের পুলিশ ও রাজ্য সরকার কঠোর পদক্ষেপকে অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।

সূত্রঃ এপি

এমকে

আরো পড়ুন

আফগানিস্তানে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভাঙন, সীমান্ত বন্ধ—প্রতারিত রোগীরা হারাচ্ছেন জীবন

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর ওয়াচ টাওয়ার গুড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল

আইসিসির দুই কর্মকর্তার পদত্যাগের কারণ ও সময় নিয়ে ধোঁয়াশা

নিউজ ডেস্ক