9.9 C
London
October 19, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

ভারতে খ্রিষ্টানদের কবর দিতেও বাধাঃ মৃতদেহ কবর থেকে তুলে গ্রামছাড়া করার অভিযোগ

ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করা আদিবাসী পরিবারগুলোকে নিজ গ্রামে স্বজনদের দাফন করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কয়েকটি ঘটনায় কবর থেকে মরদেহ তুলে অন্যত্র নিয়ে দাফন করতে পরিবারগুলোকে বাধ্য করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে জীবিত মানুষের পাশাপাশি মৃত ব্যক্তিরাও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ছত্তিশগড়ের কাঁকের জেলার ইরাদাহ গ্রামের বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী সিমলা থাপ্পা জানান, তার বাবা পাটিরাম থাপ্পা ২০২৩ সালের ১০ আগস্ট হাসপাতালে মারা যান। পরদিন সকালে পরিবারের সদস্যরা তাকে গ্রামের কবরস্থানে দাফন করেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রামের প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন মানুষ তাদের বাড়িতে এসে মরদেহ কবর থেকে তুলে গ্রামের বাইরে নিয়ে যাওয়ার দাবি জানান।

সিমলার অভিযোগ, তার পরিবার ২০১৬ সালে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গ্রামের লোকজন বারবার মরদেহ তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও নিরাপত্তার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত মরদেহটি অন্যত্র নিয়ে যেতে বাধ্য হন। সিমলার ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ভয় পাচ্ছিলেন, গ্রামবাসী তাদের মারধর করতে পারেন, এমনকি গণপিটুনিও দিতে পারেন।

পরিবারটি প্রথমে নিকটবর্তী শহর কাঁকেরে মরদেহ নিয়ে যায়। তবে সিমলার মায়ের সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ শহরের খ্রিষ্টান কবরস্থানেও দাফনের অনুমতি দেয়নি। পরে গ্রামের বাইরে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে দুধ নদীর তীরে পাটিরাম থাপ্পাকে দাফন করা হয়। এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট কাঁকের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও সংবাদমাধ্যমটি কোনো জবাব পায়নি।

সিমলা জানান, তার দাদা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল। কিন্তু তার বাবার ক্ষেত্রে এমন বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। তার দাবি, গ্রামের ১০৫ থেকে ১১০টি পরিবারের মধ্যে অন্তত ১৯টি পরিবার খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। বাবার মৃত্যুর পর আরও দুই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী মারা গেলেও তাদেরও গ্রামের বাইরে দাফন করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

ছত্তিশগড়ে খ্রিষ্টানদের দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ শুধু একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ছত্তিশগড় অ্যাসোসিয়েশন ফর জাস্টিস অ্যান্ড ইকুয়ালিটির করা একটি আবেদনে ১৪০টির বেশি পরিবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। এসব পরিবারের অভিযোগ, গ্রাম পরিষদ ও পুলিশ তাদের স্থানীয় কবরস্থানে স্বজনদের দাফন করতে বাধা দিয়েছে।

আবেদনে বস্তার এলাকার তাকরাগুড়া গ্রামের ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তের উল্লেখ রয়েছে। ওই সিদ্ধান্তে গ্রামের জমিতে অ-হিন্দুদের দাফন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, ২০২৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের ব্যাখ্যা ব্যবহার করে পুলিশ বিভিন্ন এলাকায় খ্রিষ্টানদের দাফনে বাধা দিচ্ছে, এমনকি যেখানে স্থানীয়ভাবে দাফনের বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি নেই, সেখানেও।

২০২৫ সালে ছত্তিশগড়ের বস্তার এলাকার ছিন্দাওয়াড়ায় রমেশ বাঘেলের বাবার মৃত্যুর পর একই ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। তিনি একজন যাজক ছিলেন। তার মরদেহ প্রায় তিন সপ্তাহ মর্গে পড়ে ছিল, কারণ পরিবারটি নিজ গ্রামে তাকে দাফন করার অনুমতি পেতে আইনি লড়াই চালাচ্ছিল। সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি এ বিষয়ে ভিন্নমত দেন। বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন পরিবারটির নিজস্ব জমিতে দাফনের পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মা বলেন, দাফন গ্রামসভার নির্ধারিত স্থানে হওয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত আদালত মরদেহটি নিজ গ্রাম থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের কারকাপালের খ্রিষ্টান কবরস্থানে দাফনের নির্দেশ দেন।

আবেদনকারীরা অভিযোগ করেছেন, ওই মামলায় রাজ্য সরকার আদালতকে বিভ্রান্ত করেছে। তাদের দাবি, আদালতে কারকাপালের দূরত্ব ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার বলা হলেও প্রকৃত দূরত্ব ছিল প্রায় ৬০ কিলোমিটার। বর্ষায় বন্যার কারণে যাতায়াতের পথও দুর্গম হয়ে পড়েছিল বলে তারা উল্লেখ করেন। খ্রিষ্টানদের জন্য গ্রামগুলোর বাইরে নির্দিষ্ট কবরস্থান থাকার দাবিও তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে এ ধরনের কবরস্থানের জমি ও নথিপত্রের তথ্য চেয়েও তারা নির্দিষ্ট প্রমাণ পাননি বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংগঠনটির আহ্বায়ক ডিগ্রি প্রসাদ চৌহান বলেন, খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির ঘটনা ২০১২ সাল থেকেই চলছে। তার অভিযোগ, কিছু এলাকায় খ্রিষ্টান যাজকদের গ্রামে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে বহু বছর আগে কবর দেওয়া ব্যক্তিদের কঙ্কাল তুলে গ্রামের বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, আদিবাসী সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিরোধ এই বৈষম্যের অন্যতম কারণ।

২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বিক্রম নাথ, সন্দীপ মেহতা ও এন ভি আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ আবেদনটির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কবর দেওয়া মরদেহ আর তোলা যাবে না বলে নির্দেশ দেন। কিন্তু এরপরও বিরোধ থামেনি। ইটিভি ভারত-এর জুলাই মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর বস্তারের ঢেকুনা গ্রামের হিন্দু বাসিন্দারা এক খ্রিষ্টান ব্যক্তির মরদেহ কবর থেকে তুলে অন্যত্র খ্রিষ্টান কবরস্থানে স্থানান্তরের দাবি জানান। প্রতিবেশী হাতকোঙ্গেরা গ্রামে খ্রিষ্টান ব্যক্তির দাফন নিয়ে প্রতিবাদের পর এই দাবি ওঠে।

ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও বৈষম্য বৃদ্ধির অভিযোগও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের প্রকল্প ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে সরাসরি ১ হাজার ৩০০টির বেশি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। এর বেশির ভাগই মুসলিমদের লক্ষ্য করে দেওয়া হলেও ১৬০টির বেশি ঘটনায় খ্রিষ্টানদের উল্লেখ ছিল।

২০১১ সালের ভারতের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ দশমিক ২ শতাংশ মুসলিম এবং ২ দশমিক ৩ শতাংশ খ্রিষ্টান। হিন্দুরা জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির শাসনামলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন বাড়ছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে ছত্তিশগড়ের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো জবাব পায়নি দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট।

বাবার মৃত্যুর প্রায় তিন বছর পরও সেই দিনের অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেননি সিমলা থাপ্পা। তার বক্তব্য, পরিবারটি শুধু চেয়েছিল বাবাকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে এমন জায়গায় দাফন করতে, যেখানে তার পরিবারের অন্য সদস্যরাও শায়িত আছেন। কিন্তু ধর্ম পরিবর্তনের কারণে সেই অধিকার থেকেও তাদের বঞ্চিত হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট

এমকে

আরো পড়ুন

কেনিয়ায় মানুষের মল দিয়ে তৈরি হচ্ছে জ্বালানি

প্রিন্স উইলিয়াম ইউক্রেনকে সমর্থন জানাতে মিত্রদেশ পোল্যান্ডে অবস্থান করছেন

চীনের কয়লাখনিতে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণঃ নিহত অন্তত ৯০