8.9 C
London
October 21, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

ভারতে মাসিকের কারণে কাজে অনুপস্থিত হলেই জরিমানাঃ আখশ্রমিক নারীদের ভয়াবহ চিত্র

ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে আখখেতে মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে কাজ করা বহু নারী মজুরি হারানো এড়াতে এবং দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চালিয়ে যেতে জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার করাতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণের বোঝা, কঠোর শ্রমের পরিবেশ এবং মাসিকের সময় কাজে অনুপস্থিত থাকার কারণে আর্থিক জরিমানার আশঙ্কা নারীদের এমন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

মহারাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলের বীড জেলার এসব নারী মৌসুমি কাজের জন্য শত শত কিলোমিটার দূরে চলে যান। সেখানে অস্থায়ী শিবিরে বসবাস করতে হয় তাদের, যেখানে পর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও বিশুদ্ধ পানির সুবিধাও অনেক ক্ষেত্রে নেই। স্বামীদের সঙ্গে চার থেকে পাঁচ মাস ধরে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় আখ কাটার কাজ করেন তারা। শ্রম ঠিকাদারদের কাছ থেকে নেওয়া অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করতেই মূলত এই কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।

মাসিক, অসুস্থতা কিংবা অন্য স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে কাজে যেতে না পারলে তাদের মজুরি কেটে নেওয়া হয় অথবা আর্থিক জরিমানার মুখে পড়তে হয় বলে শ্রমিকদের অভিযোগ। এ কারণে কেউ কেউ মাসিকের ব্যথা ও কর্মস্থলে অনুপস্থিতির সমস্যা এড়াতে জরায়ু অপসারণের কথা ভাবছেন, আবার কেউ ইতোমধ্যে অস্ত্রোপচার করিয়েছেন।

এমনই একজন শ্রমিক পূর্ণিমা। তিন বছর ধরে নিয়মিত ব্যথায় ভোগার পর তিনি জরায়ু অপসারণের কথা বিবেচনা করছেন। দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে তিনি বলেন, “আমার শরীরটাই যেন এই ব্যবস্থার দাস হয়ে গেছে।” অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাড় করতেও তাকে নতুন করে ঋণ নিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

বীড জেলার অনেক পরিবারের জন্য আখ কাটা মৌসুমি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। স্থানীয়ভাবে ‘মুক্কাদাম’ নামে পরিচিত শ্রম ঠিকাদারেরা চিনিকলের সঙ্গে কাজের ব্যবস্থা করেন এবং শ্রমিকদের অগ্রিম টাকা দেন। পরে আখ কাটার কাজের মাধ্যমে সেই টাকা পরিশোধ করতে হয়।

স্বামী-স্ত্রীকে একসঙ্গে কাজ করা শ্রমিক-জুটি হিসেবে ‘কোইতা’ বলা হয়। প্রতিটি জুটির প্রতিদিন প্রায় তিন টন আখ কাটার প্রত্যাশা থাকে। তাদের আয় নির্ভর করে কতটুকু আখ কাটা হয়েছে তার ওপর। কাজের নির্ধারিত গতি বজায় রাখতে না পারলে দলের অন্য সদস্যদের কাছ থেকেও জরিমানা বা আর্থিক চাপের মুখে পড়তে পারেন শ্রমিকেরা।

এমন পরিস্থিতিতে অসুস্থতা কিংবা তীব্র মাসিকের ব্যথা থাকা সত্ত্বেও নারীদের বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

সাবিতা নামে আরেক শ্রমিক ২০২৫ সালের মার্চে জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার করান। আখ ট্রাকে তোলার সময় তিনবার পড়ে যাওয়ার পরও কাজ বন্ধ করার সামর্থ্য তার ছিল না বলে তিনি দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে জানান।

কিন্তু অস্ত্রোপচারের পরও প্রত্যাশিত স্বস্তি পাননি সাবিতা। কয়েক মাস পরও রক্তপাত ও তীব্র ব্যথা অব্যাহত ছিল। চিকিৎসার জন্য পুনেতে যাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, তার শরীরে সংক্রমণ হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকারের একটি কমিটি আখ কাটার কাজে অন্যত্র যাওয়া বীড জেলার ৮২ হাজার ৩০৯ জন নারীকে নিয়ে জরিপ চালায়। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৬১ জনের জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার হয়েছিল। অস্ত্রোপচার করা নারীদের ৪৫ শতাংশের বেশি পরবর্তী সময়ে শারীরিক অথবা মানসিক কষ্টের কথা জানিয়েছিলেন।

নারী অধিকারকর্মী সংগীতা চবন দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন, কিছু নারীকে সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে অস্ত্রোপচারের জন্য বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল। কিছু কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নারীদের জরায়ু অপসারণের জন্য পাঠানোর বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর সঙ্গে কথা বলা স্বাস্থ্যকর্মীরা এ ধরনের চর্চা সম্পর্কে জানার কথা বা আর্থিক প্রণোদনা পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদার, চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে দায় নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছেন না।

জরায়ু অপসারণের উচ্চ হার এবং অভিবাসী আখশ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের পর মহারাষ্ট্র সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালের মার্চে বোম্বে হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে শ্রমিকদের নিবন্ধনব্যবস্থা উন্নত করা এবং স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।

এসব উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়ে ২০২৫ সালের নভেম্বরে একটি প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল। তবে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত সেটি প্রকাশ করা হয়নি। পূর্ণিমা ও সাবিতা দুজনই জানিয়েছেন, তারা সরকারের কাছ থেকে কোনো কল্যাণমূলক সহায়তা পাননি।

আখশ্রমিকদের ঠিকাদারেরা নারীদের অস্ত্রোপচারে বাধ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে তাদের বক্তব্য, শ্রমিকেরা কাজে না এলে আখ কাটার কাজ ব্যাহত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার সুযোগও কমে যেতে পারে। এ কারণে তাদের বেতনসহ ছুটি দেওয়া সম্ভব নয় বলে তারা দাবি করেন।

কোকা-কোলা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা সলিডারিডাদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন, ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল, কাজের উপযোগী সরঞ্জাম এবং মাসিককালীন স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত পণ্যের সুযোগ উন্নত করতে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই উদ্যোগে এক লাখ মানুষ উপকৃত হয়েছেন। তবে পেপসিকো সংবাদমাধ্যমটির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

পূর্ণিমার জন্য সিদ্ধান্তটি এখনো কঠিন। তিনি জানিয়েছেন, ব্যথা উপশমের জন্য বছরে প্রায় ৫০ হাজার ভারতীয় রুপি ব্যয় করতে হয়। অন্যদিকে অস্ত্রোপচার করাতে গেলেও নতুন করে ঋণ নিতে হতে পারে। তবু ব্যথা থেকে মুক্তি পেলে আবার কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণে সহায়তা করতে পারবেন—এমন আশাই করছেন তিনি।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট

এমকে

আরো পড়ুন

‘বোরকা আইন’ কার্যকর পর্তুগালেঃ মুখ ঢাকলে গুনতে হবে ৩ হাজার ইউরো পর্যন্ত

‘আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি’— ইসলাম গ্রহণ নিয়ে মুখ খুললেন রাখি সাওয়ান্ত

ভাতা বাড়লেও দুশ্চিন্তা বাড়ছেঃ যুক্তরাজ্যের পেনশন বয়স ৬৭-তে যাচ্ছে