21.9 C
London
August 30, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

ভালোবাসার বিয়ের আড়ালে পাচারঃ ৫ বছরে চীনে ৪,২২৬ বাংলাদেশি নারী

বিয়ের মাধ্যমে চীনে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি নারী ভয়াবহ নির্যাতন ও পাচারের শিকার হচ্ছেন—এমন উদ্বেগের মধ্যেই সামনে এসেছে নতুন পরিসংখ্যান। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পারিবারিক ভিসায় অন্তত ৪ হাজার ২২৬ বাংলাদেশি নারী চীনে গেছেন। এর মধ্যে কয়েক বছরে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের সহায়তায় এবং মানবপাচার প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশের আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। সেখানে জানানো হয়, ২০২০ সালে পারিবারিক ভিসায় ৬৯ বাংলাদেশি নারী চীনে যান। ২০২১ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭ জনে। ২০২২ সালে যান ৩৫ জন।

এরপর পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৩ সালে একই ধরনের ভিসায় চীনে যাওয়া বাংলাদেশি নারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৬ জনে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা আরও বেড়ে হয় ১ হাজার ৩৭৮। আর ২০২৫ সালে এক লাফে ১ হাজার ৭২১ জন নারী চীনে যান।

সম্প্রতি ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশি নারীদের চীনে পাচারের একাধিক ঘটনা সামনে আসার পর এসব পরিসংখ্যান নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিয়েকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র ভুক্তভোগীদের চীনা নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করে পরে বিভিন্নভাবে বিদেশে পাচার করছে।

বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ে প্রস্তাবিত একটি মানসম্মত কার্যপদ্ধতি বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার অপেক্ষায় রয়েছে।

প্রস্তাবিত নিয়মে বিদেশি নাগরিককে বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান করতে হবে। বিয়ের ক্ষেত্রে আগমনের সময় দেওয়া ভিসা গ্রহণযোগ্য হবে না। একই সঙ্গে বিয়ের আগে বিদেশি নাগরিককে নিজ দেশের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অবিবাহিত সনদ সংগ্রহ করতে হবে এবং তা বাংলাদেশে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা হাইকমিশন থেকে সত্যায়িত করে জমা দিতে হবে।

বিয়েটিও অনুমোদিত কাজি বা নিবন্ধন কর্মকর্তার মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে। পার্বত্য তিন জেলার ক্ষেত্রে স্থানীয় জেলা পরিষদের নিয়ম মেনে বিয়ে নিবন্ধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নিবন্ধনের পর বিবাহ সনদ প্রথমে নোটারি পাবলিক এবং পরে আইন মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত করার বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় মুসলিম পারিবারিক আইনের বিধানও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, একজন মুসলিম নারী শুধু মুসলিম পুরুষকে বিয়ে করতে পারবেন। অন্যদিকে মুসলিম পুরুষ মুসলিম, খ্রিস্টান বা ইহুদি নারীকে বিয়ে করতে পারবেন। পাশাপাশি ১৮৭২ সালের বিশেষ বিবাহ আইন মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না বলেও খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিয়ের মাধ্যমে নারী পাচারের ক্ষেত্রে সুবিধাবঞ্চিত, প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নারীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পাচারকারী চক্রের নজরে এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নারীসহ অন্যান্য প্রান্তিক নারীরাও রয়েছেন।

রাঙ্গামাটির এক চাকমা নারী ২০২৪ সালে এ ধরনের একটি ঘটনায় মামলা করেন। তার অভিযোগ ছিল, তার ২১ বছর বয়সী বোনকে ঢাকায় নিয়ে জোর করে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। খাগড়াছড়ির ২১ বছর বয়সী এক মারমা নারীও পৃথক অভিযোগে তাকে এক চীনা নাগরিককে বিয়ে করতে বাধ্য করার কথা জানান।

চলতি আগস্টে বাগেরহাটের ১৯ বছর বয়সী এক নারীও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, তাকে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে সেই ভিডিও দেখিয়ে তাকে ভয় দেখানো ও চাপ প্রয়োগ করে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে চীনে পাচার করা হলে সেখানে শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হন তিনি। পরে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের সহায়তায় গত ৪ আগস্ট তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

বাংলাদেশে অবৈধ বিয়ের মধ্যস্থতাকারী বা ঘটকালি চক্র নিয়ে চীনা দূতাবাসও উদ্বেগ জানিয়েছে। গত ১৪ জুলাই এক বিজ্ঞপ্তিতে দূতাবাস চীনা নাগরিকদের সতর্ক করে জানায়, অবৈধভাবে ‘কনে কেনার’ আয়োজন মানবপাচার, চাঁদাবাজি, হুমকি, শারীরিক ক্ষতি ও আর্থিক ক্ষতির মতো অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানান, পারিবারিক ভিসার আবেদন কয়েক ধাপে যাচাই করা হয়। এর মধ্যে বিবাহ সনদের সত্যতা যাচাই, ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার এবং লিখিত অঙ্গীকারনামা নেওয়ার মতো প্রক্রিয়া রয়েছে। এর মাধ্যমে বিয়েটি প্রকৃত কি না এবং সংশ্লিষ্ট নারী স্বেচ্ছায় চীনে যাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।

ইমিগ্রেশন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবু নোমান বলেন, অপরাধী চক্র ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ব্যবস্থাটির অপব্যবহার করছে। এসব অপরাধ প্রতিরোধে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ধরনের নারী পাচার আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, চলতি বছর পাস হওয়া মানবপাচার আইনে আন্তর্জাতিক প্রটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় পাচারের বিষয়টি পৃথক অধ্যায় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও তদন্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে।

তিনি জানান, আগে পাচার সংক্রান্ত মামলার সঙ্গে ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ যুক্ত থাকলে সেগুলো ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের বাইরে থাকত। নতুন ব্যবস্থায় এসব অপরাধকে সংশ্লিষ্ট মামলার আনুষঙ্গিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনালে বিচার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিয়ের নামে নারী পাচার বন্ধ করতে কেবল ভিসা যাচাই নয়, বিয়ের আগে-পরে তথ্য যাচাই, বিদেশি নাগরিকের পরিচয় ও বৈবাহিক অবস্থা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের বিষয়ে সতর্কতা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে আন্তঃদেশীয়ভাবে সমন্বিত অভিযান ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সূত্রঃ জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশ আয়োজিত কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য

এম.কে

আরো পড়ুন

মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাদ দেবে জাতিসংঘ

ইসরায়েলি বসতির পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিল বেলজিয়াম;

আবায়া পরিহিত ৬৭ মুসলিম ছাত্রীকে ফিরিয়ে দিয়েছে ফরাসি স্কুলগুলো