12 C
London
October 25, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশযুক্তরাজ্য (UK)

মাতৃভূমি বাংলাদেশে আরও বেশি আসতে চাইঃ যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি রূপা হক

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মাতৃভূমি বাংলাদেশে আরও বেশি আসতে চান যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সংসদ সদস্য রূপা হক। বাংলাদেশে এলে আগে মানুষ তাকে ‘আপা’ বা ‘আপু’ বলে ডাকলেও এখন অনেকে ‘খালামণি’ বা ‘আন্টি’ বলে ডাকছেন—এ নিয়েও অনুষ্ঠানে রসিকতা করেন তিনি।

শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের ‘বাংলাদেশ সীমানা ছাড়িয়ে প্রবাসী’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন রূপা হক। তিনি বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনের লেবার পার্টির এমপি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি এ আসন থেকে আবারও নির্বাচিত হন।

রূপা হক বলেন, আগে বাংলাদেশে এলে রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাকে ‘আপা’ বা ‘আপু’ বলে ডাকতেন। এবার এসে কেউ কেউ তাকে ‘খালামণি’ বলে ডাকছেন। দোকান বা হোটেলে যারা আগে ‘বোন’ বলে সম্বোধন করতেন, এখন তাদের কেউ কেউ ‘আন্টি’ বলছেন। তার ভাষায়, এর মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে যে তারও বয়স বাড়ছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রসঙ্গে রূপা হক বলেন, সরকারি হিসাবে প্রায় ৮৭ লাখ বাংলাদেশি দেশের বাইরে বসবাস করেন। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে বাংলাদেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে নিয়মিত মানুষের যাতায়াত, যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান চলছে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন সৌদি আরবে—প্রায় ৩৫ লাখ। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি ফ্রান্সের প্যারিস ও স্পেনের মাদ্রিদেও বড় বাংলাদেশি কমিউনিটি গড়ে উঠেছে। এসব এলাকায় বাংলা ভাষার সাইনবোর্ড, বাংলাদেশি দোকান এবং দেশীয় খাবারের উপস্থিতি প্রবাসে বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিস্তারের প্রমাণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

রূপা হক বলেন, বাংলাদেশি প্রবাসী সমাজকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তার বাবা-মায়ের প্রজন্ম ১৯৬০-এর দশকে, অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগের সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। অন্যদিকে তিনি নিজে লন্ডনে জন্মেছেন এবং ১৭ বছর বয়সের আগে বাংলাদেশে আসেননি। আবার এমন ব্রিটিশ-বাংলাদেশিও আছেন, যারা জীবনে কখনো বাংলাদেশে আসেননি।

তার মতে, প্রজন্ম, ভৌগোলিক অবস্থান ও সামাজিক শ্রেণির পার্থক্যের কারণে বাংলাদেশি প্রবাসী সমাজ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। নিজেকে সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, এই বৈচিত্র্যকে একক কোনো ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।

রূপা হক আরও বলেন, যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ সিলেট অঞ্চলের হলেও দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষেরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। তার নিজের বাবা-মায়ের বাড়ি পাবনায়। তার নানা পাবনার মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও জানান তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিষয়টিও বক্তব্যে তুলে ধরেন রূপা হক। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন। কঠিন পরিবেশে শ্রম দেওয়া এসব মানুষের বড় একটি অংশ নিজ নিজ দেশে অর্থ পাঠান, অথচ যে দেশে কাজ করেন সেখানে তারা অনেক সময় দৃশ্যমান জনসংখ্যার অংশ হিসেবে বিবেচিত হন না।

কাতারে বিশ্বকাপ আয়োজনের সময় বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অংশগ্রহণের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রচণ্ড গরম ও কঠিন পরিস্থিতিতে এসব শ্রমিকের কাজ করার বিষয়টি তুলে ধরে রূপা হক বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

রেমিট্যান্স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান। এই অর্থ দেশের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। সিলেটের বড় বড় বাড়িঘরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রভাব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দৃশ্যমান।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের দ্বিতীয় প্রজন্মের পরিচয় নিয়েও নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন রূপা হক। তিনি বলেন, ১৯৯০-এর দশকে তার পিএইচডি করার সময় গবেষণায় দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীদের এমন একটি প্রজন্ম হিসেবে তুলে ধরা হতো, যারা দুই সংস্কৃতির মাঝখানে আটকে থাকে এবং পরিচয় সংকটে ভোগে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা অনেক বদলে গেছে।

রূপা হকের ভাষ্য, এখন একজন গর্বিত ব্রিটিশ-বাংলাদেশি হয়েও যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের সদস্য হওয়া সম্ভব। তিনি নিজেই এমন একটি আসন থেকে চারবার নির্বাচিত হয়েছেন, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার বাংলাদেশি নন। যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্য থেকে চিকিৎসক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ উঠে আসছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশিদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রচলিত কিছু পুরোনো ধারণার প্রসঙ্গ টেনে রূপা হক বলেন, বাংলাদেশিরা শুধু রেস্তোরাঁয় কাজ করেন—এমন ধারণা সঠিক নয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের পাশাপাশি চতুর্থ প্রজন্মও এখন এগিয়ে আসছে। তার সন্তানও তৃতীয় প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বলে জানান তিনি।

‘নতুন করে গড়ে ওঠা এক বিশ্বে ক্ষমতা, প্রযুক্তি ও আস্থার পথচলা’ স্লোগানে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের আয়োজন করেছে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ। তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি আগামী ৫ অক্টোবর শেষ হবে।

সম্মেলনে শতাধিক দেশের প্রায় ২০০ বক্তা, ৩০০ প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছেন। এতে সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, গবেষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উদ্ভাবক ও তরুণ নেতৃত্ব অংশ নিয়েছেন।

সূত্রঃ বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের অফিসিয়াল সূত্র

এমকে

আরো পড়ুন

জাতিসংঘের নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থিতায় সৌদিসহ কয়েকটি মুসলিম দেশের সমর্থন

সিডনির ক্যামডেন কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র হলেন বাংলাদেশি এলিজা

ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধের নির্দেশ