TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

লন্ডনে রাস্তায় ৬৫ ডিগ্রি, খেলার মাঠে ৫৩ ডিগ্রিঃ তীব্র গরমে জনস্বাস্থ্য সতর্কতা জারি

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে শহরের বিভিন্ন ফুটপাত, সড়ক ও শিশুদের খেলার মাঠের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তিতে দেখা গেছে, অনেক স্থানে ভূমির তাপমাত্রা ৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। কোথাও কোথাও টারম্যাকের তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা শিশু, বয়স্ক এবং পোষা প্রাণী নিয়ে বাইরে চলাফেরায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন।

বুধবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে পরিবেশবাদী সংস্থা গ্রিনপিসের উদ্যোগে থার্মাল ইমেজিং প্রকৌশলীরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এই তাপমাত্রা পরিমাপ করেন। সে সময় লন্ডনের বাতাসের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে থার্মাল ক্যামেরায় বাতাসের নয়, রাস্তা, ফুটপাত ও অন্যান্য পৃষ্ঠের প্রকৃত তাপমাত্রা ধরা পড়ে।

জরিপে দেখা যায়, লন্ডনের বিখ্যাত রিজেন্ট স্ট্রিট ও পিকাডিলি সার্কাসের ফুটপাতের তাপমাত্রা ছিল ৫৬ থেকে ৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। উত্তর লন্ডনের ইসলিংটনের একটি শিশু পার্কের কালো রাবারের মেঝেতে বিকেল ৫টায় তাপমাত্রা ছিল ৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মধ্য লন্ডনের হলবর্নে সড়ক সংস্কারের টারম্যাকের তাপমাত্রা উঠে যায় ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

এছাড়া কিংস ক্রস স্টেশনের সামনের অংশে ৫৪ ডিগ্রি এবং গ্রেজ ইন রোডের একটি বাসস্টপের ফুটপাতে ৫৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এমনকি ব্যস্ত ভিক্টোরিয়া লাইনের একটি আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনের ভেতরের মেঝের তাপমাত্রাও প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত উচ্চ তাপমাত্রার পৃষ্ঠ শিশু ও পোষা প্রাণীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (UCL)-এর টেকসই ও স্বাস্থ্যকর নগর পরিবেশবিষয়ক অধ্যাপক আনা মাভ্রোজিয়ানি বলেন, থার্মাল ইমেজগুলো মানুষের তাপঝুঁকি সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করছে।

তার মতে, শিশু বা পোষা প্রাণীকে নিয়ে কোনো খেলার মাঠ বা জনসমাগমস্থলে যাওয়ার আগে সেখানে পৃষ্ঠের তাপমাত্রা কতটা বেড়েছে, তা বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় লন্ডনের নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত তাপ এখন কেবল আবহাওয়ার সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়েও পরিণত হয়েছে। শহরে আরও বেশি গাছ, সবুজ এলাকা, জলাধার, ছায়াযুক্ত স্থান এবং তাপ প্রতিফলনকারী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

এদিকে লন্ডনের মেয়র সাদিক খান সম্প্রতি ভবিষ্যতের তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় ‘হিট রেডি লন্ডন’ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এর আওতায় রাজধানীতে আরও বেশি গাছ লাগানো, সবুজ এলাকা সম্প্রসারণ এবং ছায়াযুক্ত জনপরিসর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মেয়রের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রচণ্ড গরমে ফুটপাত ও ভবন সূর্যের তাপ শোষণ করে অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গাছপালা ও ছায়া শুধু পরিবেশ ঠান্ডা রাখে না, বরং নগরবাসীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়ও তৈরি করে। সাদিক খান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে লন্ডনে ৬ লাখ ৪০ হাজারের বেশি গাছ লাগানো হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

এছাড়া মেয়রের ওয়েবসাইটে শহরের বিভিন্ন ‘কুল স্পেস’ বা শীতল আশ্রয়স্থলের মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে তাপপ্রবাহের সময় মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানীয় কাউন্সিলও বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে। বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহ্যাম কাউন্সিল পরামর্শ দিয়েছে, শিশুদের খেলার আগে স্লাইড ও অন্যান্য ধাতব সরঞ্জাম স্পর্শ করে দেখে নিতে হবে, কারণ প্রচণ্ড গরমে এগুলো মারাত্মকভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে ব্রিটিশ ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশন (BVA) পোষা কুকুরের মালিকদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। সংস্থাটি বলেছে, কুকুরকে খুব সকালে অথবা সন্ধ্যায় হাঁটাতে নিয়ে যাওয়া উচিত। তীব্র গরমে দিনের বেলা হাঁটানো সম্ভব হলে এড়িয়ে যাওয়াই নিরাপদ, কারণ কুকুর মানুষের মতো ঘামের মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা করতে পারে না।

সংস্থাটি ‘পাঁচ সেকেন্ডের টারম্যাক পরীক্ষা’ করার পরামর্শ দিয়েছে। অর্থাৎ, বাইরে যাওয়ার আগে হাতের তালু পাঁচ সেকেন্ড ফুটপাতের ওপর রেখে দেখতে হবে। যদি সেটি মানুষের হাতের জন্য অতিরিক্ত গরম হয়, তবে তা কুকুরের পায়ের জন্যও বিপজ্জনক।

এদিকে গ্রিনপিস ইউকের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান মেল ইভান্স বলেছেন, এটি কেবল একটি তাপপ্রবাহ নয়; বরং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া জনস্বাস্থ্য সংকট। তার ভাষায়, অস্বাভাবিক এই তাপমাত্রা মানুষের বাসস্থান, স্কুল, গণপরিবহন এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, শুধু জনপরিসরকে তাপ সহনশীল করলেই হবে না; একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাজ্যে তাপপ্রবাহের মাত্রা ও স্থায়িত্ব ক্রমেই বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় নগর পরিকল্পনা, জনসচেতনতা এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

ম্যানচেস্টার এক তাঁবুর শহর, অভিযানেও সফল হতে পারল না সিটি কাউন্সিল

অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের জন্য অ্যাসাইলাম আবেদন নিষিদ্ধ করবে হোম অফিস

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন