মাসকাটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দফার আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। তবে দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্যে এই বৈঠক নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগের দরজা খুলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা আপাতত সংঘাত ঠেকাতে সময় কিনেছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত।
২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ওমানের রাজধানী মাসকাটে কয়েক ঘণ্টার বৈঠক শেষে দুই পক্ষই তাদের প্রাথমিক অবস্থানে অটল থাকে। ইরান জোর দেয়, আলোচনা কেবল পারমাণবিক ইস্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মানবাধিকার বিষয় আলোচনায় আনতে চায়। মতপার্থক্য থাকলেও উভয় পক্ষ দ্বিতীয় দফা বৈঠকে বসতে সম্মত হয়।
এই আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর। ওই হামলায় তিনটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ইরানের দাবি অনুযায়ী প্রাণ যায় এক হাজারের বেশি মানুষের। সেই ঘটনার পর মাসকাটে আবারও দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিদের বসা কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর একটি বিরল ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রতিনিধিদলে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের উপস্থিতি আলোচনাকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
আলোচনার সময় আরব সাগরে মোতায়েন ছিল ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ এবং তার আগেই একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করে মার্কিন বাহিনী। তেহরানের দৃষ্টিতে এটি ছিল বলপ্রয়োগের হুমকির মধ্যে পরিচালিত কূটনীতি।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনাকে “খুব ভালো” আখ্যা দিয়ে বলেন, ইরান চুক্তি না করলে “কঠোর পরিণতি” ভোগ করতে হবে। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আল্টিমেটামের ভাষা আলোচনা দ্রুত করতে পারে, কিন্তু আস্থা গঠনে সহায়ক নয়।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে জেসিপিওএ চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর থেকেই ইরানের মধ্যে মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে গভীর অনাস্থা তৈরি হয়। পরবর্তীতে ইরানের ধাপে ধাপে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ানো সেই অনাস্থাকে আরও জটিল করে তোলে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসই এখন যেকোনো নতুন চুক্তির সবচেয়ে বড় বাধা।
মাসকাট আলোচনার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল পরিবহনে জড়িত ১৪টি ‘শ্যাডো ফ্লিট’ জাহাজসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ইরান এটিকে আলোচনার সঙ্গে চাপ প্রয়োগের দ্বৈত কৌশল হিসেবে দেখছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করে বলেছেন, এই অনাস্থাই আলোচনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আলোচনায় ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’-এর মার্কিন দাবি ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে ইউরেনিয়াম মজুত হ্রাস বা পাতলা করার মতো প্রযুক্তিগত বিষয় আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি মিসর, তুরস্ক ও কাতারের প্রস্তাবিত একটি আঞ্চলিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা হলেও ইরান তা গ্রহণে অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে পরোক্ষ আলোচনার সীমা পেরিয়ে মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে সরাসরি ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এটি ইঙ্গিত দেয়, ভবিষ্যৎ আলোচনায় সরাসরি সংলাপের প্রয়োজনীয়তা উভয় পক্ষই বুঝতে শুরু করেছে।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই আলোচনাকে “পরবর্তী কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আলোচনার পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দ্রুত দ্বিতীয় দফা আলোচনার সম্ভাবনা থাকলেও বিশ্লেষকদের মতে, এতে চুক্তির চেয়ে আলোচনার ধারাবাহিকতাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল হলো—না যুদ্ধ, না চুক্তি; বরং একটি নিয়ন্ত্রিত অচলাবস্থা। মাসকাট আলোচনা দেখিয়েছে, যোগাযোগের পথ খোলা আছে। তবে সেই পথ স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সামরিক সংযমের ওপর।
সূত্রঃ আল জাজিরা
এম.কে

