যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদ, ইসলামবিদ্বেষ ও উগ্র ডানপন্থার উত্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট কলাম লেখক ইয়াসমিন আলিবাই-ব্রাউন। তিনি বলেছেন, ষাটের দশকের বর্ণবাদী পরিবেশ নিজে দেখেছেন, কিন্তু বর্তমান সময়ের কিছু প্রবণতা তার কাছে আরও ভয়ংকর বলে মনে হচ্ছে। ২৭ আগস্ট প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে তিনি ব্রিটেনে মুসলিমদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাজ্যের নারী ও সমঅধিকারবিষয়ক মন্ত্রী ব্রিজেট ফিলিপসনও দেশে বর্ণবাদ ও লিঙ্গবৈষম্য ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে বলে সতর্ক করেছেন। ফিলিপসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইয়াসমিন আলিবাই-ব্রাউন তার নিবন্ধে দাবি করেন, ব্রিটেনে বসবাসরত আগের প্রজন্মের অভিবাসীদের অনেকেই মনে করছেন বর্ণবাদ বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। কর্মক্ষেত্রে প্রকাশ্য বর্ণবাদ বৃদ্ধির বিষয়ে ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের গবেষণা এবং বর্ণবাদবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের সতর্কতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
ব্রিটেনে বর্ণবাদের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি ষাটের দশকের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করেছেন। তার মতে, সে সময় কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে প্রকাশ্য বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হতো। পরবর্তী সময়ে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন এবং আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। তবে বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অনলাইনে বর্ণবাদ, বিদেশিবিদ্বেষ ও জাতীয়তাবাদী বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং প্রচলিত গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বক্তব্যের কিছু অংশও এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করছে। তার আশঙ্কা, এভাবে উগ্র ডানপন্থী ও নব্য-ফ্যাসিবাদী রাজনীতির জন্য সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতে পারে।
মুসলিমদের প্রসঙ্গে আলিবাই-ব্রাউন বলেন, ব্রিটেনে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যগুলোর একটি মুসলিম সম্প্রদায়। তিনি দাবি করেন, মুসলিমদের অবমাননা রাজনৈতিক প্রভাব ও বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
আশ্রয়প্রার্থীদের নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, সব আশ্রয়প্রার্থীকে একই দৃষ্টিতে দেখে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কিছু মানুষও যখন এ ধরনের বিদ্বেষমূলক প্রচারণায় যুক্ত হন, তখন তারা বুঝতে ব্যর্থ হন যে বর্ণবাদ শেষ পর্যন্ত কোনো একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
রাজনীতির প্রসঙ্গেও তিনি রিফর্ম পার্টির অভিবাসন ও সামাজিক আবাসনসংক্রান্ত নীতির সমালোচনা করেছেন। তিনি একটি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, বিদেশিরা এসে কাউন্সিলের বাড়িগুলো নিয়ে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ করা হলেও বাস্তব পরিসংখ্যান ভিন্ন চিত্র দেখায়। তার নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন সামাজিক আবাসন বরাদ্দের প্রায় ৯০ শতাংশ যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের দেওয়া হয়।
আলিবাই-ব্রাউন একই সঙ্গে ব্রিটিশ মুসলিম সমাজের ভেতরের কিছু বিষয় নিয়েও আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তিনি মুসলিম সমাজের মধ্যে নারী-পুরুষের ভূমিকা, পোশাক, পারিবারিকভাবে বিয়ে নির্ধারণ এবং বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার বিষয়ে আরও খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন।
লন্ডনের পাতালরেলে এক মুসলিম ব্যক্তির সঙ্গে তার কথোপকথনের ঘটনাও নিবন্ধে তুলে ধরেছেন তিনি। ওই ব্যক্তি তাকে মুসলিম নারী হিসেবে মাথা ঢাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে আলিবাই-ব্রাউন জানান। তিনি এর প্রতিবাদ করে বলেন, একজন নারী কী পোশাক পরবেন, সে সিদ্ধান্ত অন্য কেউ চাপিয়ে দিতে পারেন না। ঘটনাটিকে তিনি মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্কের একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে মুসলিমদের নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি তিনি তাদের শিক্ষাক্ষেত্র ও কর্মজীবনে অগ্রগতির কথাও ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, তরুণ মুসলিমদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়ছে। ব্রিটিশ রাজনীতিতেও মুসলিম প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এবং শিল্প-সংস্কৃতিতেও মুসলিমদের অংশগ্রহণ বেড়েছে।
তার মতে, ব্রিটিশ মুসলিমদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও সক্রিয়ভাবে আলোচনা করতে হবে। মসজিদ ও মুসলিম নেতৃত্বকে সামাজিক সমস্যা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকেও বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
আলিবাই-ব্রাউন সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর আত্মতুষ্ট থাকার সুযোগ নেই। উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষের বিস্তার এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে তিনি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন।
তার নিবন্ধের শেষ বার্তায় তিনি মূলত মুসলিম সমাজকে আরও সতর্ক, খোলামেলা ও পরিবর্তনমুখী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের সারকথা—ব্রিটেনে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোকে শুধু বাইরের বিদ্বেষের বিরুদ্ধে নয়, নিজেদের সমাজের ভেতরের সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধেও কথা বলতে হবে। একই সঙ্গে বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ব্রিটিশ সমাজেরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
এদিকে সমঅধিকারবিষয়ক মন্ত্রী ব্রিজেট ফিলিপসনের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তাও দেখাচ্ছে যে বর্ণবাদ ও যৌনবৈষম্য নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের ভেতরেও উদ্বেগ রয়েছে। তিনি বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের মধ্যে ঘৃণা ও নারীবিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
ফলে ইয়াসমিন আলিবাই-ব্রাউনের মন্তব্যকে শুধু একজন কলাম লেখকের ব্যক্তিগত উদ্বেগ হিসেবে নয়, বরং ব্রিটেনে বর্ণবাদ, ইসলামবিদ্বেষ, অভিবাসন ও উগ্র ডানপন্থার উত্থান নিয়ে চলমান বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সূত্রঃ দ্য আই পেপার
এম.কে

