বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের মধ্যেও নিজ দেশের পরিবারের সদস্যদের কাছে অর্থ পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন অভিবাসীরা। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে হলেও তারা নিয়মিতভাবে স্বজনদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন।
ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মার্সেইয়ের বিভিন্ন অর্থ স্থানান্তর প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে অভিবাসীদের দীর্ঘ সারি। তাদের অধিকাংশই পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে নিজ দেশে অর্থ পাঠাতে এসেছেন। অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও পরিবারকে সহায়তা করার দায়িত্ব থেকে সরে আসতে রাজি নন তারা।
মার্সেইয়ে বসবাসরত মরক্কো বংশোদ্ভূত এক অভিবাসী আবদেল জানান, মাসের শুরুতেই তার হাতে প্রায় কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। একটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী চালক হিসেবে কাজ করা এই ব্যক্তি বলেন, অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার জন্য দেশে থাকা পরিবারের জরুরি অর্থ প্রয়োজন হওয়ায় তাকে টাকা পাঠাতেই হয়েছে।
এক নারী অভিবাসীও একই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, মূল্যস্ফীতি তাদের জীবনকে কঠিন করে তুললেও অসুস্থ বাবা-মায়ের প্রয়োজনের সময় অর্থ পাঠানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত এবং বৈষম্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও অভিবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম স্থিতিশীল আর্থিক প্রবাহ হিসেবে টিকে রয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শুধু ফ্রান্স থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৭ বিলিয়ন ইউরো পাঠানো হয়েছে।
অর্থনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিবারকে সহায়তা করার বিষয়টি অভিবাসীদের কাছে কেবল আর্থিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি নৈতিক ও পারিবারিক অঙ্গীকার। ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, অধিকাংশ অভিবাসী বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছে অর্থ পাঠানো বন্ধ করেন না।
গবেষকদের মতে, অনেক অভিবাসী খাদ্য, পোশাক, বিনোদন কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনের খরচ কমিয়ে দেন, কিন্তু পরিবারে পাঠানো অর্থ কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে চান না। তবে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ বা শিক্ষা-সংক্রান্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলকভাবে ব্যয় সংকোচনের পথ বেছে নেন।
বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেছেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অভিবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স উন্নয়ন সহায়তা এবং বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের সম্মিলিত পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে উন্নয়নশীল বহু দেশের অর্থনীতিতে এই অর্থপ্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে এই অর্থের পেছনে অভিবাসীদের ব্যক্তিগত ত্যাগ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মানসিক চাপ এবং নানা ধরনের বঞ্চনার বিষয়টি খুব কমই আলোচনায় আসে। অনেক অভিবাসী পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ও কমিয়ে ফেলেন।
ফ্রান্সে অধ্যয়নরত কঙ্গো বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থী জেসি মাহোঙ্গেউ বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি তার বর্তমান জীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। সীমিত আয়ের মধ্যেও তিনি দেশে থাকা স্বজনদের সহায়তা করার চেষ্টা করেন। তবে তিনি মনে করেন, বিদেশে থাকা মানুষের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে অনেক পরিবারের ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে অনেক সময় রেমিট্যান্স প্রবাহ কমার পরিবর্তে উল্টো বৃদ্ধি পায়। কারণ সংকটের সময় দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের সহায়তা করতে অভিবাসীরা আরও বেশি অর্থ পাঠানোর চেষ্টা করেন। অর্থনীতিবিদরা এই প্রবণতাকে ‘বিপরীত-চক্রীয় প্রভাব’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স শুধু পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে না; এটি বিভিন্ন দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও শিক্ষাগত সম্পর্ক শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অভিবাসীদের অবদান শুধু শ্রমবাজারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রেমিট্যান্সের মাধ্যমে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
সূত্রঃ ইনফো মাইগ্র্যান্টস
এম.কে

