16.2 C
London
September 26, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ম্যানস্টন এসাইলাম সেন্টারে ভয়াবহ অব্যবস্থাপনাঃ অতিরিক্ত ভিড় ও বর্ণবাদের যোগসূত্র

কেন্টের ম্যানস্টন আশ্রয়কেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বর্ণবাদী আচরণ ও বলপ্রয়োগের মতো গুরুতর অভিযোগের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের যোগসূত্র ছিল বলে স্বাধীন তদন্তে উঠে এসেছে। ২০২২ সালের ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলমান এই তদন্তে ম্যানস্টনের পরিস্থিতি এবং সেখানে নেওয়া সরকারি সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ম্যানস্টন মূলত ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে আসা মানুষদের প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়াকরণের জন্য ব্যবহৃত একটি স্বল্পমেয়াদি হোল্ডিং ফ্যাসিলিটি। যুক্তরাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সাইটটি এই কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণভাবে সেখানে আগমনকারীদের স্বল্প সময়ের জন্য রাখা হয় এবং তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হয়।

তবে ২০২২ সালের সংকটের সময় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ম্যানস্টন সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন নতুন আগমনকারীকে ২৪ ঘণ্টার বেশি নয়—এমন স্বল্পমেয়াদি অবস্থানের জন্য ব্যবহারের উপযোগী ছিল। কিন্তু হোটেলসহ অন্য আবাসনে অনেক আশ্রয়প্রার্থীকে স্থানান্তর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার পর সেখানে মানুষের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। সংকটের চূড়ান্ত পর্যায়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রায় ৪ হাজার মানুষকে সেখানে রাখা হয়েছিল বলে তদন্তে বলা হয়েছে।

অতিরিক্ত মানুষের চাপে বহু আশ্রয়প্রার্থীকে মেঝেতে ঘুমাতে হয়। পরিবেশ হয়ে ওঠে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। তদন্তে খোসপাঁচড়া ও ডিপথেরিয়ার মতো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের কথাও উঠে এসেছে। যুক্তরাজ্যের কারা পরিদর্শন সংস্থা এর আগের এক পরিদর্শনেও ম্যানস্টনে মানুষকে মেঝেতে ঘুমাতে এবং নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় আটকে থাকতে দেখেছিল।

তদন্তে ম্যানস্টনের নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর হামলা, মাদক ব্যবহার এবং বর্ণবাদী ভাষা ব্যবহারের অভিযোগও উঠে এসেছে। কিছু কর্মী প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন না করেই সেখানে কাজ করছিলেন কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়েছে।

ম্যানস্টনে থাকা ৬০টি পরিবারকে একটি ব্যারাক ভবনের মাত্র ১১টি কক্ষে রাখা হয়েছিল বলে তদন্তে বলা হয়েছে। তাদের নয় দিন পর্যন্ত গরম পানি, গোসলের ব্যবস্থা ও পরিষ্কার পোশাকের সুবিধা ছিল না। ৮১ জনের জন্য ছিল মাত্র একটি টয়লেট এবং সেখানে সাবান বা জীবাণুনাশকও পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতির কারণে কেউ কেউ পোকামাকড়ের কামড়ের জায়গায় টুথপেস্ট ব্যবহার করেছিলেন এবং একজন ক্ষত ঢাকতে ক্রসাঁর মোড়ক ব্যবহার করেছিলেন বলে শুনানিতে জানানো হয়।

ম্যানস্টনে থাকা হোসেইন হাসিব আহমেদ নামে ৩১ বছর বয়সী এক আশ্রয়প্রার্থী ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মারা যান। তদন্তে তার চিকিৎসা ও দেখভালের ক্ষেত্রে একাধিক সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত্যুর মাত্র আড়াই ঘণ্টা আগে তার হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়েছিল বলেও শুনানিতে উঠে আসে।

তদন্তের সময় অংশগ্রহণকারী আশ্রয়প্রার্থীদের পক্ষে আইনজীবীরা ম্যানস্টনে তাদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। এক আইনজীবী জানতে চান, কেন সেখানে থাকা মানুষদের মানবিক মর্যাদার নিচে আচরণ করা হয়েছিল। আরেক আইনজীবী অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এমন একটি সংস্কৃতি ছিল যেখানে আইন না মানা এবং জবাবদিহির ঘাটতি ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। এগুলো আইনজীবীদের বক্তব্য; তদন্ত এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।

ম্যানস্টন সংকটের সময় যুক্তরাজ্যের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়েও তদন্তে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও ঋষি সুনাক ম্যানস্টন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেলও তদন্তে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

অংশগ্রহণকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবী লরা ডুবিনস্কি কেসি তদন্তে বলেন, বহু আশ্রয়প্রার্থীকে হোটেলে স্থানান্তর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তটি ডাউনিং স্ট্রিটের তৎকালীন চিন্তাধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় ম্যানস্টন নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রেখেছিল। তবে এই বক্তব্য তদন্তে উপস্থাপিত একটি পক্ষের বক্তব্য, চূড়ান্ত তদন্ত-রায় নয়।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল তদন্তে জানান, ছোট নৌকায় করে আসা মানুষের সংখ্যা সামাল দিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন অপর্যাপ্ত বলে বিবেচিত হয়েছিল। ম্যানস্টন ও পরবর্তী আবাসনের জন্য অর্থের বিষয়টিও তখন আলোচনায় ছিল।

ম্যানস্টন নিয়ে স্বাধীন তদন্তের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ। যুক্তরাজ্য সরকারের প্রকাশিত শর্ত অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১ জুন থেকে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ম্যানস্টনে আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছিল এবং সেই পরিস্থিতির পেছনে কী সিদ্ধান্ত, পদক্ষেপ ও পরিস্থিতি কাজ করেছিল—তা তদন্তের আওতায় রয়েছে। তদন্তের চেয়ারম্যান হলেন সোফি কার্টরাইট কেসি।

যুক্তরাজ্যের হোম অফিস বর্তমানে ম্যানস্টনকে ছোট নৌকায় আসা ব্যক্তিদের প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণের জন্য ব্যবহার করছে। সরকারের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো ভবন ও অস্থায়ী স্থাপনা থাকা সাইটটির অবকাঠামো উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ২০২৫ সালের সরকারি ব্যয় পর্যালোচনার পর নতুন প্রসেসিং সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রেখে বিদ্যমান স্থাপনার উন্নয়নে অর্থ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চলমান তদন্তের শুনানিতে ম্যানস্টনের ২০২২ সালের পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সরকারি সিদ্ধান্তগুলো কী ভূমিকা রেখেছিল এবং সেখানে আটক আশ্রয়প্রার্থীদের সঙ্গে আইন ও মানবিক মানদণ্ড অনুযায়ী আচরণ করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ই গুরুত্ব পাচ্ছে। তদন্তের পরবর্তী শুনানির তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এমকে

আরো পড়ুন

নতুন করে ফিরছে ইলেকট্রিক গাড়ির ভর্তুকিঃ সর্বোচ্চ £৩,৭৫০ ছাড়, কারা পাবেন সুবিধা?

ইউকেতে আঘাত হেনেছে স্টর্ম সিয়ারান, যোগাযোগ ব্যবস্থা লণ্ডভণ্ড

লন্ডনে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি স্কুলশিক্ষককে হত্যা