TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যের গণপরিবহনে বাড়ছে জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধ

যুক্তরাজ্যের গণপরিবহনে জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ট্রেন ও অন্যান্য পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ভ্রমণের সময় বর্ণ ও ধর্মের ভিত্তিতে হয়রানি, হুমকি ও হামলার ঘটনা বেড়েছে, যার ফলে অনেক মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং নিয়মিত যাতায়াত সীমিত করে দিচ্ছেন।

ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশের (বিটিপি) তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডজুড়ে জাতিগত বিদ্বেষমূলক অপরাধ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ২,৮২৭টি, যা ২০২৪-২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,২৫৮টিতে। একই সময়ে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধও বেড়েছে—২০১৯-২০ সালে ৩৪৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হলেও ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে ৪১৯টিতে পৌঁছায়। যদিও পরের বছর সামান্য কমে ৩৭২টি হয়, তবু সামগ্রিক প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপরিবহনে এ ধরনের অপরাধের একটি আলাদা বাস্তবতা রয়েছে। অনেক সময় হামলাকারীরা মদের প্রভাবে বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, ভুক্তভোগীকে আলাদা করে ফেলে এবং পরবর্তী স্টেশনে নেমে যাওয়ায় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে অপরাধীরা প্রায়ই শাস্তির বাইরে থেকে যায়।
স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় কোর্টনি নামের এক তরুণী ট্রেনে যাত্রার সময় প্রকাশ্য বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হন।

এক বয়স্ক নারী তার দিকে বর্ণবাদী মন্তব্য করতে থাকেন এবং একপর্যায়ে জীবাণুনাশক স্প্রে তার দিকে ছিটিয়ে দেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে কোর্টনি ঘটনাটি ভিডিও ধারণ করেন নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে। পরে কয়েকজন সহযাত্রী এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়ান, যা তাকে মানসিকভাবে সাহস জুগিয়েছে।

কোর্টনির অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রম নয়। বর্ণবাদবিরোধী ও ধর্মীয় অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো জানাচ্ছে, অনেক মানুষ এখন গণপরিবহনে চলাচলের সময় সবসময় সতর্ক থাকে। বিশেষ করে দৃশ্যমানভাবে মুসলিম পরিচয় বহনকারী নারী-পুরুষদের জন্য বাসের ওপরের ডেক বা ফাঁকা ট্রেনের কামরা প্রায়ই আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী আকিলা আহমেদ বলেন, তাদের কাছে আসা অভিযোগগুলোর মধ্যে গণপরিবহনে সংঘটিত হামলাগুলো সবচেয়ে জটিল ও মানসিকভাবে ক্ষতিকর। তার ভাষায়, অনেক মুসলিম এখন প্রতিটি আচরণ ও অঙ্গভঙ্গি নিয়ে অতিরিক্ত সচেতন থাকতে বাধ্য হচ্ছেন—ভয় থাকে, সামান্য কিছু ভুলভাবে ব্যাখ্যা হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে।

তিনি আরও জানান, স্কুলে যাওয়া-আসার পথে শিশুরাও এসব হামলার শিকার হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
স্কটল্যান্ডের বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন কোয়ালিশন ফর রেসিয়াল ইকুয়ালিটি অ্যান্ড রাইটস বলছে, প্রকাশিত পরিসংখ্যান বাস্তব চিত্রের সম্পূর্ণ প্রতিফলন নয়। অনেক ভুক্তভোগী ভয়, অনাস্থা বা ঝামেলার আশঙ্কায় অভিযোগই করেন না। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কমিউনিটি সেফটি ট্রাস্টের নীতিবিষয়ক প্রধান ডেভ রিচ বলেন, সাম্প্রতিক দুই বছরে গণপরিবহনে জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গে আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের একটি যোগসূত্র রয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েল-গাজা সংঘাতের পর ইহুদিবিদ্বেষী হামলা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয়।

এ বিষয়ে ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, ঘৃণাজনিত কোনো অপরাধই সহ্য করা হবে না। এ ধরনের ঘটনার অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন এবং ভুক্তভোগী বা প্রত্যক্ষদর্শীদের নীরব না থাকার আহ্বান জানান।
সার্বিকভাবে, পরিসংখ্যান ও অভিজ্ঞতা—দুটিই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাজ্যের গণপরিবহন ব্যবস্থায় নিরাপত্তা ও আস্থার ঘাটতি বাড়ছে। কমিউনিটি সংগঠনগুলো মনে করছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী আইনপ্রয়োগ, সিসিটিভি নজরদারি এবং জনসচেতনতা জরুরি হয়ে পড়েছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রিটেনে হত্যা সন্দেহে পাঁচ শিশু গ্রেপ্তার

অবশেষে ব্রিটেনে কমছে তেল ও দুধের দাম

যুক্তরাজ্যে ডিউটির সময় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন তরুণ পুলিশ অফিসার ফায়জান নাজিব