যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি জুলাইয়ের সাময়িক ধাক্কা কাটিয়ে আগস্টে আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস—জুলাই ও আগস্টে—যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৯১৫ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৮৮২ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দুই মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৩৩ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার।
তবে এই প্রবৃদ্ধি দুই মাসে সমান ছিল না। জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যে পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল। পরের মাসে আগস্টে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ায় সেই ঘাটতি অনেকটাই পুষিয়ে যায়।
ইপিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মাসিক গড় দাঁড়িয়েছে ৪৫৭ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পুরো বছরে যুক্তরাজ্যে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে গত অর্থবছরের মাসিক গড় ছিল প্রায় ৩৬৫ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের মাসিক গড় রপ্তানি আয় গত অর্থবছরের মাসিক গড়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে মাত্র দুই মাসে গত অর্থবছরের পুরো বছরের যুক্তরাজ্যভিত্তিক পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রায় ২০ দশমিক ৮৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানিতেও আগস্টে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশের পণ্য রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। জুলাই-আগস্ট মিলিয়ে মোট পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তৈরি পোশাক খাত। আগস্টে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে নিটওয়্যার রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির জন্য যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার। জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম পণ্য রপ্তানি গন্তব্য ছিল; ওই মাসে দেশটিতে মোট রপ্তানি হয়েছিল ৪৭৮ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাত অবশ্য একই সময়ে নানা চাপের মুখেও রয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়াচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং কিছু রপ্তানি আদেশ কমেছে বা বাতিল হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয় এবং প্রায় ৪০ লাখ মানুষ এই শিল্পে কর্মরত। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব এই খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর সরাসরি পড়ছে।
এর মধ্যেই যুক্তরাজ্যের বাজারে আগস্টের দ্বি-অঙ্কের প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও একই সময়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৬১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগস্টে একক মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
ফলে চলতি অর্থবছরের শুরুতে বাংলাদেশের প্রধান পোশাক রপ্তানি বাজারগুলোতে চাহিদা বৃদ্ধির চিত্র দেখা যাচ্ছে। তবে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা—এসব বিষয় আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাজ্যের বাজারে আগস্টের প্রবৃদ্ধি তাই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের ধারার একটি অংশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের পরবর্তী মাসগুলোতে এই প্রবৃদ্ধি কতটা ধরে রাখা যায়, সেটিই এখন রপ্তানি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সূত্রঃ রয়টার্স
এমকে

