19.6 C
London
June 12, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে অনুমোদন পেল ওজন কমানোর ওয়েগোভি ট্যাবলেটঃ মিলবে ব্যক্তিগত প্রেসক্রিপশনে

যুক্তরাজ্যে স্থূলতা মোকাবিলায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। দেশটির ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা মেডিসিনস অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রোডাক্টস রেগুলেটরি এজেন্সি (এমএইচআরএ) প্রথমবারের মতো ওজন কমানোর ট্যাবলেট হিসেবে ওয়েগোভি (Wegovy) অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে যোগ্য রোগীরা শিগগিরই চিকিৎসকের ব্যক্তিগত প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে এই ওষুধ কিনতে পারবেন।

এই অনুমোদনের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে ওয়েগোভির ট্যাবলেট সংস্করণ ব্যবহারের অনুমতি দিল। একই সঙ্গে এটি ইউরোপের প্রথম দেশ, যেখানে এই ওষুধ অনুমোদন পেল।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ওজন কমানোর জন্য ওয়েগোভির ইনজেকশন সংস্করণ ব্যবহার করা হলেও ট্যাবলেট আকারে এই ওষুধ বাজারে আসায় চিকিৎসা গ্রহণ আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ওষুধটি প্রস্তুতকারী ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নোভো নরডিস্ক জানিয়েছে, এই অনুমোদন যুক্তরাজ্যে স্থূলতা চিকিৎসার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করবে। প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক কার্যক্রম বিভাগের নির্বাহী সহ-সভাপতি এমিল কংসহয় লারসেন বলেন, “এটি একটি যুগান্তকারী অনুমোদন, যা স্থূলতা চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।”

ওয়েগোভি ট্যাবলেটে রয়েছে সেমাগ্লুটাইড নামের সক্রিয় উপাদান, যা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং ক্যালোরি গ্রহণ কমাতে ভূমিকা রাখে।

এমএইচআরএর নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ওষুধ শুধুমাত্র নির্দিষ্ট শ্রেণির রোগীদের জন্য প্রযোজ্য। যাদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ৩০ বা তার বেশি, অর্থাৎ যারা স্থূলতায় ভুগছেন, অথবা যাদের বিএমআই ২৭ থেকে ৩০-এর মধ্যে এবং এর সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্যান্য ওজন-সম্পর্কিত স্বাস্থ্য জটিলতা রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এই ওষুধ গ্রহণ করতে পারবেন।

ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, সর্বোচ্চ মাত্রার ডোজ গ্রহণকারীরা ৬৪ সপ্তাহে শরীরের মোট ওজনের প্রায় ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম হয়েছেন, যা স্থূলতা চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে আপাতত এই ওষুধ এনএইচএসের আওতায় পাওয়া যাবে না। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সিলেন্স (নাইস) চূড়ান্ত অনুমোদন না দেওয়া পর্যন্ত রোগীদের ব্যক্তিগত প্রেসক্রিপশন নিয়েই এটি সংগ্রহ করতে হবে।

এখনও ট্যাবলেটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। তবে রোগীদের প্রত্যাশা, এটি ইনজেকশনের তুলনায় সাশ্রয়ী হবে। বর্তমানে ব্যক্তিগতভাবে ওয়েগোভি ইনজেকশন নিতে মাসে ৯০ থেকে ৩০০ পাউন্ড পর্যন্ত ব্যয় হয়।

চিকিৎসা পদ্ধতি অনুযায়ী, নতুন রোগীদের প্রথমে ১ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম ডোজ দিয়ে শুরু করা হবে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে ৪ মিলিগ্রাম, ৯ মিলিগ্রাম এবং সর্বোচ্চ ২৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ডোজ বাড়ানো হবে। প্রতিটি ধাপে কমপক্ষে এক মাস করে অবস্থান করতে হবে।

যারা ইতোমধ্যে ব্যক্তিগতভাবে প্রতি সপ্তাহে ২ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম ওয়েগোভি ইনজেকশন নিচ্ছেন, তারা উপযুক্ত বিবেচিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিদিনের ২৫ মিলিগ্রাম ট্যাবলেটে পরিবর্তিত হতে পারবেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই ওষুধকে কোনোভাবেই “জাদুকরী সমাধান” হিসেবে দেখা উচিত নয়।

ওষুধটি গ্রহণের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ নিয়ম। রোগীদের অন্তত আট ঘণ্টা উপবাসের পর খালি পেটে সামান্য পানি দিয়ে ট্যাবলেট গ্রহণ করতে হবে এবং ওষুধ সেবনের পর অন্তত ৩০ মিনিট কোনো খাবার বা পানীয় গ্রহণ করা যাবে না।

ওয়েগোভি ট্যাবলেটের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ও বমি। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে রোগীদের চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে পরামর্শ করার পাশাপাশি এমএইচআরএর ইয়েলো কার্ড স্কিমে তা রিপোর্ট করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

রয়্যাল কলেজ অব জিপিজের সভাপতি অধ্যাপক ভিক্টোরিয়া টজোর্টজিও ব্রাউন বলেন, ট্যাবলেট আকারে ওজন কমানোর ওষুধ পাওয়া গেলে অনেক রোগীর জন্য তা ইনজেকশনের তুলনায় বেশি সুবিধাজনক হবে। তবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং আচরণগত পরিবর্তনের বিকল্প হিসেবে এই ওষুধকে বিবেচনা করা উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওমেটাবলিক মেডিসিনের অধ্যাপক নাভিদ সাত্তার বলেন, যুক্তরাজ্যে স্থূলতার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কার্যকর চিকিৎসার বিকল্প বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, ওবেসিটি হেলথ অ্যালায়েন্সের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথারিন জেনার সতর্ক করে বলেন, কোনো ওষুধই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যব্যবস্থা ও স্থূলতার সামাজিক কারণগুলো দূর করতে পারে না। তার মতে, স্থূলতা মোকাবিলায় চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক নীতি—দুটোই সমান গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়েগোভি ট্যাবলেটের অনুমোদন স্থূলতা চিকিৎসায় একটি বড় অগ্রগতি হলেও এটি কেবলমাত্র একটি চিকিৎসা উপকরণ। দীর্ঘমেয়াদে সফল ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস এবং চিকিৎসকদের নিয়মিত তত্ত্বাবধান অপরিহার্য।

যুক্তরাজ্যে স্থূলতার হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন এই ওষুধ লাখো মানুষের জন্য আশার বার্তা নিয়ে এলেও এর নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

টিউলিপ সিদ্দিকের স্থলাভিষিক্ত হলেন এমা রেনল্ডস

নিজ দেশের বিমানবন্দরেই চরম হয়রানির শিকার ব্রিটিশ সাংবাদিক

তৃতীয় জাতীয় লকডাউনে যুক্তরাজ্য, স্কুল বন্ধ