TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে ইউক্রেনীয়দের গৃহহীন হওয়ার শঙ্কাঃ কমছে এসাইলাম-সিকারদের ভাতা

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের মধ্যে গৃহহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনীয়দের বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া ব্যক্তিদের জন্য সরকারের ‘হোমস ফর ইউক্রেন’ প্রকল্পের অর্থায়ন বড় পরিসরে কমানোর সিদ্ধান্তের পর এই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আশ্রয়দাতাদের মাসিক ‘ধন্যবাদ’ ভাতা ৩৫০ পাউন্ড থেকে কমিয়ে ১০০ পাউন্ড করা হবে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর জরুরি ভিত্তিতে ‘হোমস ফর ইউক্রেন’ প্রকল্প চালু করা হয়। এরপর যুক্তরাজ্যে নিরাপত্তার জন্য আসা প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার ইউক্রেনীয়ের মধ্যে ১ লাখ ৮১ হাজার জনকে এই প্রকল্পের আওতায় সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

ব্রিটিশ সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে কার্যকর হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলোর জন্য বরাদ্দও কমানো হবে। বর্তমানে ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের গ্রহণ ও প্রকল্প পরিচালনার ব্যয় মেটাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রতি আগমনের জন্য অর্থ পেয়ে থাকে।

১৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের আবাসন, কমিউনিটি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সংসদে দেওয়া এক লিখিত বিবৃতিতে জানায়, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য নির্ধারিত অর্থ ৫ হাজার ৯০০ পাউন্ড থেকে কমিয়ে ৩ হাজার ৩০০ পাউন্ড করা হবে।

অন্যদিকে আশ্রয়দাতাদের মাসিক অর্থ ৩৫০ পাউন্ড থেকে কমিয়ে ১০০ পাউন্ড করা হলে অনেক আশ্রয়দাতার পক্ষে ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদে আশ্রয় দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

৭৩ বছর বয়সী ইউক্রেনীয় শরণার্থী তেতিয়ানা গত দুই বছর চার মাস ধরে যুক্তরাজ্যে একজন আশ্রয়দাতার বাড়িতে বসবাস করছেন। সরকারি সিদ্ধান্তের কথা জানার পর তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তেতিয়ানা জানিয়েছেন, অর্থ কমে যাওয়ার কারণে তার আশ্রয়দাতা তাকে আর রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত। আশ্রয় শেষ হয়ে গেলে কোথায় যাবেন, কীভাবে নতুন করে জীবন শুরু করবেন এবং কীভাবে বাড়িভাড়া পরিশোধ করবেন—এসব নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

খারকিভ থেকে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে আসা তেতিয়ানা বয়স ও চলাফেরার সমস্যার কারণে কাজ করতে পারেন না। যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি হওয়ায় নিজের শহরে ফিরে যাওয়াও তার জন্য কঠিন বলে তিনি জানিয়েছেন।

শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া ব্যক্তিরাও সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নাতালিয়া রুমিয়ানৎসেভা তার মাকে আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইউক্রেন থেকে আসা শরণার্থীদের নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে এবং ভাষা শিখতে সময় প্রয়োজন। তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা যদি ধীরে ধীরে সাধারণ বাণিজ্যিক ভাড়ার সম্পর্কে পরিণত হয়, তাহলে সেটি শরণার্থীদের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

গ্রিনউইচের একজন আশ্রয়দাতাও জানিয়েছেন, ২০২২ সালের মে মাস থেকে তিনি এই প্রকল্পে যুক্ত। আশ্রয়দাতাদের দেওয়া অর্থ কমে যাওয়ায় তিনি এখন ইউক্রেনীয় শরণার্থীকে আগের মতো রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তার দাবি, স্পনসর হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি চাকরি হারিয়েছিলেন এবং তখন থেকে এই অর্থ তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছিল।

কার্ডিফের আরেক আশ্রয়দাতা জানিয়েছেন, তারা যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা একজন ইউক্রেনীয়কে বিশ্বাসের জায়গা থেকে নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ওই শরণার্থী যুক্তরাজ্যে ভবিষ্যৎ জীবন গড়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন। এখন সরকারি অর্থ কমানোর সিদ্ধান্তের ফলে দুই পক্ষের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিকল্প ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। আশ্রয়দাতারা চাইলে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে বাড়িওয়ালা হিসেবে শরণার্থীদের কাছ থেকে ভাড়া নিতে পারবেন। তবে এতে ‘হোমস ফর ইউক্রেন’ প্রকল্পের মূল আশ্রয়ভিত্তিক কাঠামো কতটা পরিবর্তিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ‘হোমস ফর ইউক্রেন’ প্রকল্পে ১ দশমিক ৮১ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের আবাসন, কমিউনিটি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় অবশ্য জানিয়েছে, ইউক্রেনীয়দের সহায়তার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তিত রয়েছে এবং ‘হোমস ফর ইউক্রেন’ প্রকল্প চালু থাকবে। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, জরুরি পরিস্থিতিতে শুরু হওয়া প্রকল্পটি এখন দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। তাই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এবং আশ্রয়দাতা, ইউক্রেনীয় অতিথি ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সহায়তা অব্যাহত রাখতে অর্থায়নে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

তবে নতুন অর্থায়ন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর আশ্রয়দাতারা কতজন ইউক্রেনীয়কে আগের মতো রাখতে পারবেন এবং আশ্রয় হারানো শরণার্থীদের জন্য বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা কী হবে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর হলে এর বাস্তব প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এমকে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে শরণার্থী নীতিতে বড় পরিবর্তন, আদালতে চ্যালেঞ্জ সুদানের দুই আশ্রয়প্রার্থীর

প্রধানমন্ত্রীর দিওয়ালির অনুষ্ঠানে ঢালাও মদ-মাংস, ক্ষুব্ধ ব্রিটিশ হিন্দুরা

রাজা নিজ হাতে নাইট উপাধি দিলেন ডেভিড বেকহ্যামকে, ভিক্টোরিয়ার ডিজাইনেই মুগ্ধ সম্রাট