9.8 C
London
October 21, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে ইমিগ্রেশন আইনজীবীর দুর্নীতিঃ ৪৫ হাজার পাউন্ডের জরিমানা এড়ানোর কৌশল ফাঁস

যুক্তরাজ্যে অনিয়মিত কর্মী নিয়োগের জরিমানা এড়াতে ব্যবসার প্রকৃত মালিকের পরিবর্তে বিদেশে থাকা অন্য একজনকে মালিক হিসেবে দেখানোর প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ইমিগ্রেশন আইনজীবীর বিরুদ্ধে। বিবিসির গোপন অনুসন্ধানে ব্র্যাডফোর্ডের আইনজীবী মোহাম্মদ আলিয়াস ইউসুফের কথোপকথন ধারণ করা হয়েছে। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, কাউকে মিথ্যা তথ্য দিতে বা অসত্য দাবি করতে তিনি কখনো পরামর্শ দেননি।
বিবিসির প্রতিবেদক নিজেকে এমন একটি মিনিমার্টের মালিক পরিচয় দিয়ে আলিয়াসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যার বিরুদ্ধে অনিয়মিতভাবে কর্মরত একজনকে নিয়োগের কারণে ৪৫ হাজার পাউন্ড জরিমানা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। বাস্তবে দোকান, কর্মী কিংবা জরিমানার কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
গোপন ফোনালাপে আলিয়াস জানান, জরিমানা এড়ানোর ব্যবস্থা করতে তিনি জরিমানার ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ৪ হাজার ৫০০ পাউন্ড ফি নেবেন এবং আগাম টাকা দিতে হবে। তিনি এমন একজনকে ব্যবসার মালিক হিসেবে দেখানোর কথা বলেন, যিনি যুক্তরাজ্যের বাইরে থাকেন। কথোপকথনে ইরাক বা ইরানে ফিরে যাওয়া কারও নাম ব্যবহার করা যায় কি না, তা-ও জানতে চান তিনি।
আলিয়াস একটি কাল্পনিক উদাহরণ দিয়ে বলেন, অন্য কাউকে মালিক হিসেবে দেখানো হলে জরিমানাটি তার নামে যেতে পারে, অথচ ওই ব্যক্তি ইরাকে থাকবেন। বিবিসির প্রতিবেদনে এ ধরনের ব্যবস্থাকে ‘ঘোস্ট ডিরেক্টর’ ব্যবহারের সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে প্রকৃত মালিকের পরিচয় আড়াল করতে অন্য কাউকে কাগজে-কলমে ব্যবসার মালিক বা পরিচালক হিসেবে দেখানো হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, এ ধরনের অবৈধ চর্চা ব্যাপকভাবে দেখা যায়।
বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষ করে কুর্দি ভাষার কয়েকটি ফেসবুক পেজে আলিয়াস ও তার প্রতিষ্ঠান লিবার্টি সলিসিটর্সের নাম উল্লেখ করে ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল। এসব ভিডিওতে কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিবাসনসংক্রান্ত জরিমানা সমাধানে তার ভূমিকার প্রশংসা করেন। কোনো কোনো ভিডিও ২০ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছিল। আলিয়াস দাবি করেছেন, এসব ভিডিও তিনি তৈরি, অর্থায়ন, অনুমোদন বা প্রচার করেননি।
গোপন ক্যামেরা নিয়ে বিবিসির প্রতিবেদক ব্র্যাডফোর্ডে আলিয়াসের কার্যালয়ে যান এবং আগাম ফি হিসেবে ২৫০ পাউন্ড দেন। প্রতিবেদকের ভাষ্য অনুযায়ী, আলিয়াস প্রথমে ৫০০ পাউন্ড চেয়েছিলেন, তবে অর্থ নেওয়ার পর কোনো রসিদ দেননি।
পরে প্রতিবেদক সামান নামে পরিচয় দেওয়া আরেক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে কথা বলান। ওই ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে বিবিসির আরেকজন গোপন প্রতিবেদক ছিলেন। কথোপকথনে সামান জানান, তিনি দোকানটির মালিক নন, এমনকি দোকানটি কখনো দেখেনওনি; তবে নিজের নামে মালিকানা নিতে রাজি আছেন। আলিয়াস বারবার তাকে মালিক হিসেবে নিশ্চিত করতে বলেন। সামান প্রকৃত মালিক নন বলে জানানোর পর আলিয়াস বলেন, এমন অবস্থায় তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে তাকে মালিক হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন না।
তবে একই কথোপকথনে আলিয়াসকে বলতে শোনা যায়, কর্তৃপক্ষ টাকা দাবি করলেও তারা টাকা না দিলে বিষয়টি শেষ হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, জরিমানার মুখে পড়া ব্যক্তিদের জন্য এ ধরনের কাজ তিনি নিয়মিত করেন বলে সামানকে জানান।
জ্যেষ্ঠ ইমিগ্রেশন আইনজীবী ব্রায়োনি রেস্ট বিবিসির রেকর্ডিং শুনে বলেন, কোনো আইনজীবীর পক্ষ থেকে ব্যবসার মালিক হিসেবে মিথ্যা পরিচয় ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, এ ধরনের আচরণ ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির শামিল হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর পেশাগত নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরে আলিয়াস বার্তা পাঠিয়ে ওই ধরনের মিথ্যা দাবি নিয়ে এগোবেন না বলে জানান। পরবর্তী ফোনালাপেও তিনি বলেন, অসত্য বা অসৎ দাবি নিয়ে তিনি কাজ করবেন না এবং আগাম দেওয়া ২৫০ পাউন্ড ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। বিবিসি জানিয়েছে, টাকা এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি। তবে আলিয়াসের দাবি, তার প্রতিষ্ঠান একাধিকবার টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
বিবিসির হাতে পাওয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে অনিয়মিত কর্মী নিয়োগের জন্য আরোপ করা অন্তত ১৫ কোটি পাউন্ড জরিমানা এখনো আদায় হয়নি। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এ ধরনের অভিযোগে ৫ হাজার ৭৫৫টি জরিমানা করা হয়েছিল, যার মোট মূল্য ২১ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬ কোটি ৫ লাখ পাউন্ড।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জানিয়েছেন, জরিমানা আরোপের পর সব অর্থ একই সময়ের মধ্যে আদায় হয় না। আপিল এবং দ্রুত পরিশোধের ক্ষেত্রে ছাড়সহ বিভিন্ন কারণে আদায়ের পরিমাণ মোট জরিমানার চেয়ে কম হতে পারে। ২০২৪ সালে জেনেশুনে অনিয়মিত কর্মী নিয়োগের সর্বোচ্চ জরিমানার পরিমাণ ১৫ হাজার পাউন্ড থেকে বাড়িয়ে ৬০ হাজার পাউন্ড করা হয়।
বিবিসির অনুসন্ধানের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ জরিমানা আরোপ ও আদায়ের পদ্ধতি পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, নিয়ম না মানা এবং জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান সব ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করা নিশ্চিত করাই এই পর্যালোচনার লক্ষ্য। অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনার জন্য তিনি বিবিসিকে ধন্যবাদ জানান।
আলিয়াস অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি কখনো কাউকে প্রকৃত মালিক নন—এমন ব্যক্তির নামে জরিমানা স্থানান্তর করতে কিংবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে মিথ্যা তথ্য দিতে পরামর্শ দেননি। তার ভাষ্য, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় জরিমানার বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোই তার কাজ। তিনি আরও দাবি করেছেন, বিবিসির প্রতিবেদক অন্য ব্যক্তির নামে ব্যবসা স্থানান্তরের প্রস্তাব দিলে তিনি লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন যে অসত্য বা অসৎ দাবি নিয়ে এগোবেন না এবং ওই ব্যক্তির পক্ষে কাজও করেননি।
সূত্রঃ বিবিসি নিউজ
এমকে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে আশ্রয় হোটেল আশ্রয় নয় যেন আতঙ্কঃ অভিবাসী হোটেলগুলোতে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা

এআই খাতে ব্রিটেনকে বিশ্বনেতা বানাতে নতুন পরিকল্পনা স্টারমারের

যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন একজন নারী