24.1 C
London
June 29, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে কেয়ার কর্মীদের জন্য স্থায়ী বসবাসে ১৫ বছরের শর্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক

যুক্তরাজ্যে অভিবাসী কেয়ার কর্মীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের (ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন-আইএলআর) জন্য অপেক্ষার সময় ৫ বছর থেকে ১৫ বছরে বাড়ানোর সরকারি পরিকল্পনা ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিক অধিকার সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং অভিবাসী কেয়ার কর্মীরা সরকারের এই প্রস্তাবকে ‘নিষ্ঠুর’, ‘অমানবিক’ ও ‘বিবেকবর্জিত’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন।

একই সঙ্গে হোম অফিসের মন্ত্রী মাইক ট্যাপের এমন একটি প্রস্তাবও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে তিনি কেয়ার কর্মীদের এই নতুন কঠোর নিয়মের বাইরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের সঙ্গে প্রকাশ্য মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।

সরকারের নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাধারণভাবে স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে স্বল্প ও মধ্যম দক্ষতার পেশায় কর্মরতদের জন্য, যার মধ্যে সামাজিক সেবা বা কেয়ার সেক্টরও রয়েছে, এই সময়সীমা ১৫ বছর পর্যন্ত নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে মাইক ট্যাপ একটি নিবন্ধে বলেন, অভিবাসী কেয়ার কর্মীদের ক্ষেত্রে এই নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়। কারণ তারা যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতের সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।

তার এই অবস্থানের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের কাছে মাইক ট্যাপকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সংবেদনশীল সরকারি নথি ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তার প্রবেশাধিকারও সীমিত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি সরকারের প্রস্তুতাধীন অভিবাসন নীতির তথ্য ফাঁস করেছিলেন।

এদিকে শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলো মাইক ট্যাপের অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে।

ওয়ার্ক রাইটস সেন্টারের প্রধান নির্বাহী ড. ডোরা-অলিভিয়া ভিকল বলেন, যুক্তরাজ্যের প্রয়োজনেই এসব মানুষ বৈধভাবে দেশটিতে এসেছেন। এখন নিয়ম পরিবর্তন করে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দেওয়া শুধু নিষ্ঠুরই নয়, একটি লেবার সরকারের জন্যও তা অত্যন্ত বিবেকবর্জিত সিদ্ধান্ত।

তিনি বলেন, নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দায়িত্ব নিলে এই পরিকল্পাটি বাতিল করাই হবে সবচেয়ে সঠিক পদক্ষেপ।

অন্যদিকে ট্রেড ইউনিয়ন ইউনিসনের সামাজিক সেবা বিভাগের প্রধান গ্যাভিন এডওয়ার্ডস বলেন, যারা যুক্তরাজ্যের একটি অত্যাবশ্যকীয় জনসেবা খাতকে সচল রেখেছেন, তাদের জন্য মাঝপথে নিয়ম পরিবর্তন করা মুখে চপেটাঘাতের সামিল।

তার মতে, বর্তমান স্পন্সরশিপভিত্তিক ভিসা ব্যবস্থার কারণে কর্মীরা নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার সঙ্গে আবদ্ধ থাকেন। ফলে অনেক নিয়োগকর্তা এই সুযোগে ভয়ভীতি প্রদর্শন, কম বেতন দেওয়া, অতিরিক্ত কাজ করানোসহ নানা ধরনের শোষণ চালিয়ে থাকেন।

এদিকে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেইসব কেয়ার কর্মীরা, যারা ইতোমধ্যেই পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।

জিম্বাবুয়ে থেকে ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে আসা এক কেয়ার কর্মী (ছদ্মনাম জোসেফিন) জানান, চাকরির শুরুতে তাকে নিয়োগকর্তার বাড়ির বাগানের একটি কাঠের ঘরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। রাতে টয়লেটের পরিবর্তে একটি বালতি ব্যবহার করতে হতো এবং গোসলের জন্যও সীমিত পরিমাণ পানি দেওয়া হতো।

তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে আসতে নিজের মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করতে হয়েছে এবং স্বজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। চাকরি হারানোর ভয়েই তিনি দীর্ঘদিন মুখ খুলতে পারেননি।

বর্তমানে তার স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার আর মাত্র ১০ মাস বাকি। কিন্তু সরকারের নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে তাকে আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।

তার ভাষায়, “আমি আমার কাজকে ভালোবাসি। সমাজের জন্য অবদান রাখতে চাই। কিন্তু এখন আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছি।”

অন্যদিকে নাইজেরিয়া থেকে ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে আসা আরেক কেয়ার কর্মী (ছদ্মনাম কার্লা) জানান, অনেক সময় তিনি টানা এক মাসও কোনো ছুটি ছাড়াই কাজ করেছেন।

তিনি বলেন, প্রতিদিন ভোরে কাজ শুরু করে রাত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে নিজের কিশোরী মেয়ের সঙ্গেও সময় কাটানোর সুযোগ পান না।

তার অভিযোগ, অতিরিক্ত কাজের চাপে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়লেও ভিসার কারণে প্রতিবাদ করার সাহস পান না। কারণ চাকরি হারালে যুক্তরাজ্যে থাকার সুযোগও হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

কার্লা বলেন, নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে তাকে আরও দীর্ঘ সময় একই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হবে, যা তিনি অমানবিক বলে মনে করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, কেয়ার খাতে দীর্ঘদিন ধরেই জনবল সংকট মোকাবিলায় বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল যুক্তরাজ্য সরকার। এমন পরিস্থিতিতে স্থায়ী বসবাসের সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিলে নতুন কর্মী আকর্ষণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যমান কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ফলে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য এবং সামাজিক সেবা খাতের জনবল সংকট—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন কিয়ার স্টারমার বা নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য বড় রাজনৈতিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে ফিশ অ্যান্ড চিপসে হানা, ভুয়া পরিচয়ে কর্মী নিয়োগে হোম অফিসের কঠোর শাস্তি

১ হাজার কর্মী নিয়োগ করবে ব্রিটেনের পিজা এক্সপ্রেস

অনলাইন ডেস্ক

ইংল্যান্ডে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট, ওয়ার্ক ফ্রম হোম ও মাস্ক ব্যবহারের কঠোর নীতি ঘোষণা

অনলাইন ডেস্ক