শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা জোরদার করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাজ্য সরকার। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট ও ইনস্টাগ্রামসহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হতে পারে। বয়স যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা হবে মুখমণ্ডল স্ক্যান প্রযুক্তিসহ উন্নত ডিজিটাল ব্যবস্থা।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার সোমবার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। সরকার মনে করছে, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অনলাইন ঝুঁকি কমাতে এ ধরনের পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
সরকারি প্রস্তাব অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ন্যূনতম বয়সসীমা বর্তমান ১৩ বছর থেকে বাড়িয়ে ১৬ বছর করা হবে। নতুন নিয়ম বাস্তবায়নে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মুখমণ্ডল স্ক্যান বা ফেসিয়াল এজ এস্টিমেশন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ডিজিটাল ক্যামেরার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর আনুমানিক বয়স নির্ধারণ করা হবে। এটি অনেকটা অ্যালকোহল বিক্রির ক্ষেত্রে প্রচলিত “চ্যালেঞ্জ ২৫” নীতির মতো, যেখানে বয়স কম মনে হলে পরিচয়পত্র দেখাতে হয়।
এছাড়া অফকমের সুপারিশ অনুযায়ী ডিজিটাল পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ক্রেডিট কার্ড, ওপেন ব্যাংকিং তথ্য, মোবাইল অপারেটরের বয়স যাচাই এবং ইমেইল ব্যবহারের ইতিহাস বিশ্লেষণের মতো বিকল্প পদ্ধতিও ব্যবহার করা হতে পারে।
সরকারের পরিকল্পনায় ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের রাতের বেলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়টিও রয়েছে। একই সঙ্গে শিশুদের দীর্ঘ সময় অনলাইনে ধরে রাখতে ব্যবহৃত তথাকথিত “আসক্তিকর” ফিচারগুলোর ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে।
এর মধ্যে রয়েছে অবিরাম স্ক্রলিং ব্যবস্থা, “লাইক” বাটনের মতো জনপ্রিয়তা নির্দেশক ফিচার এবং ব্যবহারকারীদের সামনে নির্দিষ্ট ধরনের কনটেন্ট তুলে ধরতে ব্যবহৃত অ্যালগরিদম।
প্রস্তাবিত বিধিনিষেধের আওতায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের লাইভস্ট্রিম করার সুযোগ বন্ধ করা হতে পারে। পাশাপাশি গেমিং প্ল্যাটফর্মসহ বিভিন্ন অনলাইন সেবায় প্রাপ্তবয়স্ক অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধাও সীমিত করা হবে।
রোমান্টিক বা যৌন সম্পর্কভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত চ্যাটবট ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। শিশুদের অনলাইনে যৌন হয়রানি ও শোষণের ঝুঁকি কমাতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকার।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কঠোর বয়স যাচাই এবং কার্যকর নজরদারি ছাড়া এই উদ্যোগ সফল হবে না। তারা অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ টেনে বলেছেন, সেখানে ১৬ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারির ছয় মাস পরও প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু বিভিন্ন উপায়ে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে।
গত মাসে প্রকাশিত অফকমের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮ থেকে ১২ বছর বয়সী প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জন এমন অনলাইন সেবা ব্যবহার করছে, যেখানে ন্যূনতম বয়সসীমা ১৩ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
জানা গেছে, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট ও ইনস্টাগ্রামের মতো কয়েকটি বড় প্ল্যাটফর্ম নতুন বিধিনিষেধের আওতায় আসতে পারে। তবে শিক্ষামূলক গুরুত্ব রয়েছে এমন অ্যাপ এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো কিছু বার্তাবিনিময় প্ল্যাটফর্মকে এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হতে পারে।
অনলাইন নিরাপত্তা কর্মী ব্যারোনেস কিডরন বলেছেন, শুধু নতুন নিয়ম প্রণয়ন করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই উদ্যোগের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
অন্যদিকে, সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী লর্ড ন্যাশ বলেছেন, শিশুদের সুরক্ষায় বয়সসীমা ১৬ বছরে উন্নীত করার সিদ্ধান্তকে কার্যকর করতে শক্তিশালী বয়স যাচাই ব্যবস্থা অপরিহার্য।
তিনি বলেন, “শিশুদের একটি প্রজন্ম যে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। আমাদের তাদের শৈশব ফিরিয়ে দিতে হবে।”
এদিকে এপ্রিল মাসে পাস হওয়া চিলড্রেনস ওয়েলবিয়িং অ্যান্ড স্কুলস অ্যাক্ট সরকারের হাতে নতুন আইন প্রণয়ন ছাড়াই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়েছে।
তবে নতুন বিধিনিষেধ কবে থেকে কার্যকর হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। সরকার চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও, সেগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে অফকমের ওপর। ফলে আগামী বছরের ইস্টারের আগে এই নিয়মগুলো পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায়বদ্ধতা নিয়ে বিতর্কও সমানতালে চলবে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

