যুক্তরাজ্যে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হওয়া শিশু প্রেস্টনকে তার চতুর্থ জন্মদিনে স্মরণ করেছে পরিবার, বন্ধু ও অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী। বুধবার ব্ল্যাকপুলের ফ্ল্যাগ মার্কেটে আয়োজিত এক আবেগঘন স্মরণসভায় মোমবাতি প্রজ্বলন, নীরবতা পালন এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে ছোট্ট প্রেস্টনের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো হয়।
মাত্র ১৩ মাস বয়সে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে প্রাণ হারায় প্রেস্টন। আদালতের রায়ে জানা গেছে, তার দত্তক পিতা, ল্যাঙ্কাশায়ারের ব্ল্যাকপুলের বাসিন্দা এবং পেশায় শিক্ষক ৩৭ বছর বয়সী জেমি ভারলি শিশুটির ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়েছিলেন। একই ঘটনায় ভারলির সঙ্গী ৩২ বছর বয়সী জন ম্যাকগোয়ান-ফাজাকারলেকেও যৌন নিপীড়ন, শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ এবং একটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে দেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার তাদের সাজা ঘোষণা করা হবে।
স্মরণসভায় উপস্থিত হয়ে প্রেস্টনের জৈবিক পিতা গ্যারি নোলান বিবিসি নর্থ ওয়েস্ট টুনাইটকে বলেন, “আমার ছেলে চার মাস ধরে এক দানবের হাতে আতঙ্কের মধ্যে ছিল। আজ তার জন্মদিনে তাকে জীবিত থাকার কথা ছিল, মৃত নয়।”
তার এই মন্তব্যে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা মোমবাতি জ্বালান, টেডি বিয়ার নিয়ে আসেন এবং শিশুটির স্মরণে সাবানের বুদবুদ উড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান। এক পর্যায়ে ব্যাগপাইপের সুরের মধ্য দিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২২ সালের জুন মাসে জন্ম নেওয়া প্রেস্টনকে জন্মের কিছুদিন পরই ওল্ডহ্যাম কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়। জন্মের পাঁচ দিন পর তাকে পালক পিতা-মাতার কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং জীবনের প্রথম ১০ মাস তাদের সঙ্গেই কাটে।
তবে ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে জেমি ভারলি ও জন ম্যাকগোয়ান-ফাজাকারলে দত্তক গ্রহণের অনুমোদন পান এবং প্রেস্টন তাদের ব্ল্যাকপুলের বাড়িতে বসবাস শুরু করে। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, তাদের কাছে থাকার প্রায় চার মাসেরও কম সময়ে প্রেস্টন নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও অমানবিক আচরণের শিকার হয়। তার শরীরে অন্তত ৪০টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।
বিচার চলাকালে আরও জানা যায়, মৃত্যুর আগে কয়েক মাসের মধ্যে তিনবার প্রেস্টনকে ব্ল্যাকপুল ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের ২৭ জুলাই তার মৃত্যু হয়।
স্মরণসভার আয়োজক নিয়াম কার্ডওয়েল-ক্লার্ক বলেন, এই আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে প্রেস্টনের ভয়াবহ পরিণতির চেয়ে তার নিষ্পাপ ও সুন্দর অস্তিত্বকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া।
তিনি বলেন, “আমরা চাই মানুষ প্রেস্টনকে তার জীবনের ট্র্যাজেডির জন্য নয়, বরং সে যে সুন্দর ছোট্ট শিশুটি ছিল, সেভাবেই মনে রাখুক।”
এদিকে, প্রেস্টনের জন্মদিন উপলক্ষে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ নিজেদের বাড়িতে মোমবাতি জ্বালিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করেছেন। অনেকেই শিশুটির জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার আরও কঠোর তদারকির দাবি জানিয়েছেন।
প্রেস্টনের মর্মান্তিক মৃত্যু যুক্তরাজ্যের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং দত্তক গ্রহণ প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে শিশুটির স্মরণসভা সমাজের কাছে একটি বার্তাও পৌঁছে দিয়েছে— কোনো শিশুই যেন অবহেলা, নির্যাতন কিংবা নিষ্ঠুরতার শিকার না হয়।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

