যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। দলটির প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাংসদরা এখন শুধু তাকে সরানো সম্ভব কি না তা নয়, বরং কীভাবে একটি ‘সুশৃঙ্খল ক্ষমতা হস্তান্তর’ করা যায়—তা নিয়েই অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছেন।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, স্টারমারকে সরানোর কোনো আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক পদ্ধতি না থাকায় এখন রাজনৈতিক চাপ তৈরি, সম্ভাব্য সময়সূচি নির্ধারণ, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রতিযোগিতা বাধ্য করা এবং কোন পরিস্থিতিতে পরিবর্তন শুরু হতে পারে—এসব নিয়েই আলোচনা চলছে।
একজন লেবার সাংসদ বলেন, “প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সময় এলে এবং যদি প্রয়োজনীয় সমর্থন থাকে, তাহলে একটি পথ বের হয়ে যাবে।”
দলের এক জ্যেষ্ঠ সূত্রের মতে, আগামী স্থানীয় নির্বাচনে লেবারের ফল খারাপ হলে জুনিয়র মন্ত্রীদের পদত্যাগ শুরু হতে পারে, যা নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক আবরণ তৈরি করবে। এতে অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারাও সামনে আসতে সাহস পাবেন।
যদিও কিয়ার স্টারমার প্রকাশ্যে জানিয়েছেন তিনি পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত লেবারকে নেতৃত্ব দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তবে তার ঘনিষ্ঠরাও স্বীকার করছেন—দলকে বোঝানোর জন্য তার হাতে সীমিত সময় রয়েছে। একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, স্টারমারের হাতে সর্বোচ্চ নয় মাস সময় রয়েছে নিজেকে পুনরায় গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য।
দলের ভেতরে কে এই পরিবর্তনের চাপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ বলছেন, ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের ঘনিষ্ঠরা দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর চান, যাতে তিনি সংসদে ফিরে নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের সমর্থকরাই দ্রুত নেতৃত্ব পরিবর্তনের পক্ষে সক্রিয়।
জ্যেষ্ঠ এমপিরা অবশ্য বলছেন, এটি কোনো একক গোষ্ঠীর অভিযান নয়। বরং পুরো সংসদীয় লেবার পার্টিজুড়েই হতাশা এবং উদ্বেগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
একজন ব্যাকবেঞ্চার বলেন, “আমাদের একটি সুশৃঙ্খল রূপান্তর দরকার। বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন, স্টারমারের জন্য সব শেষ।”
আরেকজন জ্যেষ্ঠ সাংসদ বলেন, দলের মনোবল এখন “সর্বনিম্ন পর্যায়ে” পৌঁছেছে। বিশেষ করে গত এক সপ্তাহে হতাশা অনেক বেড়েছে।
সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। অনেক সাংসদ মনে করছেন, যাদের নাম সামনে আসছে, তাদের কেউই এখনো পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা বা পরিষ্কার কর্মসূচি সামনে আনেননি।
এদিকে সানডে টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্টারমার নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তার প্রধানমন্ত্রিত্ব শেষ হয়ে গেছে কি না। উত্তরে তিনি বলেন, “না।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা ১৪ বছর অপেক্ষা করিনি শুধু নির্বাচিত হওয়ার জন্য। এত কিছু করিনি শুধু জিতে থেমে যাওয়ার জন্য—পরিবর্তনের যে সুযোগ পেয়েছি, তা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে হবে।”
পরবর্তী নির্বাচনে তিনিই লেবারকে নেতৃত্ব দেবেন কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে তার সরাসরি জবাব ছিল, “হ্যাঁ।”
তবে দলের অনেকেই মনে করছেন, লেবারকে রাজনৈতিকভাবে বাঁচানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হবে স্টারমারের নিজেই বিদায়ের সময়সূচি ঘোষণা করা। অনেকে আশা করছেন, পার্টি সম্মেলনের আগেই একটি সুশৃঙ্খল প্রস্থান ঘটবে, যাতে নতুন নেতৃত্বের জন্য পথ তৈরি হয়।
স্টারমারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের বিতর্কে। অভিযোগ উঠেছে, নিরাপত্তা যাচাই কর্মকর্তারা ছাড়পত্র না দেওয়ার সুপারিশ করলেও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় স্টারমারের সিদ্ধান্ত এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান অলি রবিন্সকে দ্রুত বরখাস্ত করাও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
যদিও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড্যারেন জোন্স বলেছেন, “লর্ড ম্যান্ডেলসনের নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়নি। পুরো পরিস্থিতি দুঃখজনক।”
আগামী মাসে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং ইংল্যান্ডের স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল লেবারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে যাচ্ছে। খারাপ ফল এলে স্টারমারের নেতৃত্ব আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
ডাউনিং স্ট্রিট সূত্র জানায়, ফল প্রকাশের পর স্টারমার নম্র ও বাস্তববাদী প্রতিক্রিয়া জানাবেন। ভোটারদের বার্তা স্বীকার করে সরকার নতুন আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করবে। পরবর্তী রাজার ভাষণকে সেই সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে দলীয় নেতারাই স্বীকার করছেন, ভোটারদের কাছে সরকারের সাফল্য সঠিকভাবে তুলে ধরতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। বরং নিজেদের ভুলেই নেতিবাচক শিরোনাম তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে স্টারমার এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের রাজনৈতিক টিমকে শক্তিশালী করতে একজন অভিজ্ঞ কৌশলবিদ নিয়োগের চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভেতরের অস্থিরতা এবং নির্বাচনী অনিশ্চয়তার মধ্যে সেই কাজও সহজ হবে না বলেই মনে করছেন দলীয় নেতারা।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

