নাশীত রহমান | লন্ডন | ৩০ অক্টোবর ২০২৬
যুক্তরাজ্যে যুদ্ধ, নির্যাতন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার শরণার্থীদের নিরাপদ ও বৈধ উপায়ে আশ্রয় দেওয়ার লক্ষ্যে নতুন দুটি অভিবাসন কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাজ্যের নিবন্ধিত দাতব্য সংস্থা ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো শরণার্থীদের স্পনসর করার সুযোগ পাবে।
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Home Office) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে নতুন কর্মসূচির অধীনে লিড স্পনসর (Lead Sponsor) হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যোগ্য দাতব্য ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো আবেদন করতে পারবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শরৎকাল থেকে নতুন ব্যবস্থায় প্রথম শরণার্থীরা যুক্তরাজ্যে আসতে শুরু করতে পারেন।
শরণার্থীদের জন্য দুটি নতুন অভিবাসন পথ – ব্রিটিশ সরকার প্রাথমিকভাবে দুটি নতুন কর্মসূচি চালু করতে যাচ্ছে। প্রথমটি হলো Named Community Sponsorship Route। এই ব্যবস্থায় অনুমোদিত স্পনসরদের সহায়তায় স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান শরণার্থীদের যুক্তরাজ্যে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে পারবে।
দ্বিতীয়টি হলো Refugee Study Route -এর মাধ্যমে যোগ্য শরণার্থীরা যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এ কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। এ ছাড়া সরকার পৃথক একটি Refugee Work Route চালুর পরিকল্পনা করেছে। এই কর্মসূচিতে ২০২৭ সালের বসন্তকাল থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন কর্মসূচিগুলোর উদ্দেশ্য শুধু শরণার্থীদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া নয়; বরং তাঁদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা।
কারা লিড স্পনসর হতে পারবে? সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত দাতব্য সংস্থা অথবা যোগ্য অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো লিড স্পনসর হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবে। তবে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে সুনামসম্পন্ন হতে হবে এবং শরণার্থীদের সহায়তা ও তত্ত্বাবধানের জন্য প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক সক্ষমতা, সুরক্ষাব্যবস্থা ও সম্পদ থাকতে হবে। অনুমোদিত লিড স্পনসরদের দায়িত্ব হবে স্থানীয় স্পনসর গ্রুপ গঠনে সহায়তা করা, স্পনসরশিপের ব্যবস্থা যাচাই করা এবং শরণার্থীদের পুনর্বাসন কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা।
এই ব্যবস্থায় স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠন, চার্চ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। শরণার্থীদের আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় সরকারি ও সামাজিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শুধু ইচ্ছা করলেই সরাসরি একজন শরণার্থীকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসতে পারবে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সরকারের নির্ধারিত যোগ্যতা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
কানাডার মডেল অনুসরণ করছে যুক্তরাজ্য – ব্রিটিশ সরকারের নতুন উদ্যোগটি কানাডার দীর্ঘদিনের বেসরকারি শরণার্থী স্পনসরশিপ ব্যবস্থার আদলে তৈরি করা হচ্ছে। কানাডায় প্রায় ৫০ বছর ধরে বেসরকারি ও কমিউনিটি স্পনসরশিপের মাধ্যমে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। এই মডেলের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, শরণার্থীদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব শুধু সরকারের ওপর সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় কমিউনিটি, দাতব্য সংস্থা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। ব্রিটিশ সরকার মনে করছে, এ ধরনের ব্যবস্থায় শরণার্থীদের সামাজিক একীভূতকরণ সহজ হবে এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে উঠবে।
প্রথমে কয়েক শ, পরে কয়েক হাজার শরণার্থী – সরকার জানিয়েছে, নতুন কর্মসূচি এবং বিদ্যমান UK Resettlement Scheme-এর আওতায় প্রাথমিকভাবে কয়েক শ শরণার্থী যুক্তরাজ্যে আসবেন। পরবর্তী সময়ে অবৈধ অভিবাসনের সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে এবং স্থানীয় কমিউনিটিগুলোর স্পনসর করার সক্ষমতা বৃদ্ধির ভিত্তিতে এই সংখ্যা কয়েক হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নতুন ব্যবস্থাটি হবে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত। কতজন শরণার্থীকে গ্রহণ করা হবে, তা নির্ভর করবে স্থানীয় স্পনসরদের সক্ষমতা এবং সরকারের নির্ধারিত সীমার ওপর। অর্থাৎ এটি কোনো উন্মুক্ত বা সীমাহীন শরণার্থী গ্রহণ কর্মসূচি নয়।
সরকারের বক্তব্য – যুক্তরাজ্যের সীমান্ত নিরাপত্তা ও আশ্রয়বিষয়ক মন্ত্রী আনা টার্লি বলেছেন, নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন কমিউনিটি যুদ্ধ ও নির্যাতনের শিকার শরণার্থীদের স্বাগত জানাতে পারবে এবং তাঁদের নতুন জীবন গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারবে। তিনি বলেন, দাতব্য সংস্থা, কমিউনিটি সংগঠন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই উদ্যোগের কেন্দ্রে থাকবে। সরকার আগামী কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন দাতব্য ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করবে, যাতে নতুন কর্মসূচিগুলো কার্যকর ও সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।
দাতব্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সমর্থন – নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে শরণার্থীবিষয়ক বিভিন্ন সংগঠন এবং UNHCR – জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা। Citizens UK-এর প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ বোল্টন বলেছেন, স্থানীয় কমিউনিটির হাতে শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর সুযোগ তুলে দেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের জীবন পরিবর্তনের পাশাপাশি শরণার্থী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে।
Community Sponsorship Alliance-এর সহসভাপতিরাও নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, কমিউনিটি স্পনসরশিপ ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ শরণার্থীদের নিরাপদ আশ্রয় ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। Pathways International-এর গ্লোবাল ডিরেক্টর হান্না গ্রেগরি বলেছেন, কানাডার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে নির্দিষ্ট শরণার্থীদের স্পনসর করার ব্যবস্থা স্থানীয় জনগণ এবং নতুন আগতদের মধ্যে শক্তিশালী ও স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।
যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য নতুন সম্ভাবনা – নতুন কর্মসূচি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং বাংলাদেশি পরিচালিত নিবন্ধিত দাতব্য সংস্থাগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাজ্যে বহু বাংলাদেশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিটি উন্নয়ন এবং মানবিক সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যেগুলো সরকারের নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করবে, তারা লিড স্পনসর হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবে অথবা অনুমোদিত লিড স্পনসরদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেতে পারে।
তবে নতুন কর্মসূচিতে বাংলাদেশি নাগরিক বা বাংলাদেশ থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের অংশগ্রহণের নির্দিষ্ট যোগ্যতা, শর্ত ও সুযোগ সম্পর্কে প্রকাশিত ঘোষণায় বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত কোনো ব্যক্তি তাঁর আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত কাউকে সরাসরি এই কর্মসূচির মাধ্যমে নিয়ে আসতে পারবেন—এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। বিশেষ করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক নিপীড়ন, সহিংসতা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই নতুন ব্যবস্থা ভবিষ্যতে কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট অভিবাসন বিধি ও বিস্তারিত সরকারি নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।
আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ, তবে বিদ্যমান অ্যাসাইলাম ব্যবস্থার বিকল্প নয় – নতুন কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শরণার্থীদের যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর আগেই একটি নির্ধারিত বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসন পথের মাধ্যমে পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা। এটি যুক্তরাজ্যে ইতোমধ্যে অবস্থানরত ব্যক্তিদের সাধারণ অ্যাসাইলাম আবেদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে এক নয়। যাঁরা বর্তমানে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে আবেদন করেছেন অথবা যাঁদের অ্যাসাইলাম আপিল বিচারাধীন রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই নতুন ঘোষণা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো নতুন অভিবাসন মর্যাদা বা আশ্রয়ের অধিকার সৃষ্টি করে না। একইভাবে নতুন স্পনসরশিপ কর্মসূচির ঘোষণা মানেই যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত সব অনিয়মিত অভিবাসীর জন্য বৈধতা অর্জনের নতুন সুযোগ নয়।
যুক্তরাজ্যের শরণার্থী নীতিতে নতুন অধ্যায় – ব্রিটিশ সরকার অতীতে সিরিয়া, ইউক্রেন, হংকং এবং অন্যান্য সংকটপূর্ণ অঞ্চল থেকে বিপদগ্রস্ত মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য বিভিন্ন বিশেষ কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনীয় নাগরিকদের জন্য অনুমতির মেয়াদ বাড়ানো, গাজা থেকে গুরুতর আহত শিশুদের চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং গাজার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষাসংক্রান্ত সহায়তার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ থেকে শরণার্থীদের ব্যক্তিগত আবেদন নয়, বরং যোগ্য দাতব্য ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর লিড স্পনসর হওয়ার আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে। প্রথম শরণার্থী আগমনের পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৭ সালের শরৎকালে। যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ও শরণার্থী নীতিতে এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
লেখক: নাশীত রহমান, লন্ডন, যুক্তরাজ্য, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
লেখক পরিচিতি – নাশীত রহমান যুক্তরাজ্যভিত্তিক একজন বিশিষ্ট ও অভিজ্ঞ আইনজীবী, যিনি ইমিগ্রেশন, অ্যাসাইলাম ও মানবাধিকার আইনে বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবেও তাঁর রয়েছে তিন দশকেরও বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য পেশাগত অভিজ্ঞতা। তিনি জনপ্রিয় সরাসরি সম্প্রচারিত আইনি অনুষ্ঠান “Law with N Rahman”-এর দীর্ঘদিনের উপস্থাপক। যুক্তরাজ্যের সংসদীয় ও নীতিনির্ধারণী আলোচনা, অভিবাসন আইন, মানবাধিকার এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর লেখালেখি, আইনি বিশ্লেষণ, পরামর্শ ও অবদান ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

