TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে হোটেল ছেড়ে সামরিক শিবিরে আশ্রয়প্রার্থী রাখার উদ্যোগে তীব্র বিরোধিতা

যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য হোটেল ব্যবহারের পরিবর্তে সাবেক সামরিক ঘাঁটিগুলোকে আবাসন হিসেবে ব্যবহার করার সরকারি পরিকল্পনা নতুন করে আইনি জটিলতার মুখে পড়েছে। স্থানীয় কাউন্সিল, জনপ্রতিনিধি এবং বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, যেসব এলাকায় হাজার হাজার আশ্রয়প্রার্থীকে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনসেবা নেই। ফলে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় জনজীবনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে।

বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ঘোষণা দেন, সরকার তিনটি অতিরিক্ত সাবেক সামরিক ব্যারাককে আশ্রয়প্রার্থী আবাসন কেন্দ্রে রূপান্তরের জন্য পরিকল্পনা অনুমোদনের আবেদন করছে। এসব কেন্দ্রে মোট তিন হাজার ৭৫০ জন আশ্রয়প্রার্থীকে রাখা হবে।

এর পাশাপাশি বর্তমানে ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি সামরিক স্থাপনায় আরও এক হাজার ৭৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে এসব স্থাপনার লিজ আরও সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের জন্য ব্যয়বহুল হোটেল ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা।

নতুন প্রস্তাবিত কেন্দ্রগুলোর একটি উত্তর ইয়র্কশায়ারের সাবেক বিমানবাহিনী ঘাঁটিতে গড়ে তোলা হবে। ২০২২ সালেও সেখানে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যাপক আন্দোলন এবং কাউন্সিলের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়।

উত্তর ইয়র্কশায়ার কাউন্সিলের নেতা কার্ল লেস বলেন, কাউন্সিলের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা পরামর্শ ছাড়াই সরকার পুনরায় এই পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।

আগের আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক কাউন্সিলর ম্যালকম টেইলর বলেন, চার বছর আগের অবস্থান থেকে তাদের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার ভাষায়, “এটি ভুল পরিকল্পনা এবং ভুল জায়গা।”

নতুন করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব ধরনের বিকল্পই এখন খোলা রয়েছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য স্যার অ্যালেক শেলব্রুক বলেন, আগের পরিকল্পনা যে কারণে বাতিল হয়েছিল, সেই বাস্তবতা এখনও বদলায়নি।

তার মতে, এলাকাটিতে পর্যাপ্ত পানি, বিদ্যুৎসহ প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা নেই। দোকানপাট বা অন্যান্য নাগরিক সুবিধাও অপ্রতুল। তাছাড়া এলাকাটি অত্যন্ত প্রত্যন্ত হওয়ায় সেখানে একসঙ্গে প্রায় এক হাজার ২০০ জন আশ্রয়প্রার্থী এলে পুরো জনপদ চাপের মুখে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, আশ্রয়প্রার্থীরা সারাক্ষণ ঘাঁটির ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবেন না; তারা বাইরে চলাফেরা করতে পারবেন। ফলে স্থানীয় জনগণের ওপর এর বড় প্রভাব পড়বে।

দ্বিতীয় কেন্দ্রটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত একটি সামরিক সরবরাহকেন্দ্রে।

সংশ্লিষ্ট জেলা কাউন্সিলের নেতা লেসলি ম্যাকলিন বলেন, সেখানে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও জনসেবা নিশ্চিত না করেই কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উদ্বিগ্ন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ক্যালাম মিলার বলেন, মাত্র ৩৭০ জন বাসিন্দার একটি গ্রামের পাশে এত বড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। নিকটতম দোকানও কয়েক মাইল দূরে এবং সেখানে নিরাপদ চলাচলের মতো অবকাঠামো নেই।

তার প্রশ্ন, সরকার কীভাবে মনে করছে এত মানুষ স্থানীয় সমাজের সঙ্গে নিরাপদভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে।

তৃতীয় কেন্দ্রটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে এমন একটি সাবেক সামরিক ঘাঁটিতে, যা শীতল যুদ্ধের সময় গোপন পারমাণবিক বোমা সংরক্ষণাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

পাশের নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য নিক টিমোথি বলেন, সেখানে কাগজপত্রবিহীন আশ্রয়প্রার্থীদের রাখা হলে এলাকার নিরাপত্তা, সরকারি সেবা এবং সামাজিক সম্প্রীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এদিকে এসেক্সের একটি সাবেক বিমানঘাঁটিতে বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় আশ্রয়প্রার্থী আবাসন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। সরকার সেটি অনির্দিষ্টকালের জন্য চালু রাখার পাশাপাশি এর ধারণক্ষমতা ৮০০ থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ২৪৫ জনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট জেলা কাউন্সিল।

কাউন্সিল নেতা টম কানিংহাম বলেন, গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে তাদের এলাকার ওপর দেশের সবচেয়ে বড় আশ্রয়কেন্দ্রের চাপ রয়েছে। এখন সেটিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য চালু রাখার সিদ্ধান্তে স্থানীয় জনগণকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, শুরু থেকেই তারা সরকারকে জানিয়ে আসছেন যে প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত এই সাবেক বিমানঘাঁটিতে এত বড় কেন্দ্র পরিচালনার মতো অবকাঠামো নেই।

অন্যদিকে পার্লামেন্টের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিও এই সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

কমিটির চেয়ারপারসন ডেম ক্যারেন ব্র্যাডলি বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার কোনো শিক্ষা নেয়নি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানুষদের সঙ্গে আগে আলোচনা না করে সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিচার বিষয়ক মন্ত্রী জেক রিচার্ডস স্বীকার করেছেন, এই পরিকল্পনা স্থানীয়ভাবে বিরোধিতার মুখে পড়বে।

তিনি বলেন, সরকার ব্রিটিশ জনগণকে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য হোটেল ব্যবহার বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তার ভাষায়, বড় সামরিক ঘাঁটিগুলো তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালনা করা সম্ভব। সীমান্ত ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং আশ্রয়ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে সরকার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

নাইজাল ফারাজের টরি-রিফর্ম কোয়ালিশন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

নিউজ ডেস্ক

অপরাধী ও ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীদের ফিরিয়ে দিতে প্রীতি প্যাটেলের নতুন উদ্যোগ

লন্ডনের ফ্লাট থেকে ৫ মিলিয়ন পাউন্ড জব্দ