19.2 C
London
August 28, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুদ্ধের শঙ্কায় জরুরি প্রস্তুতির বার্তা যুক্তরাজ্যেঃ ঘরে খাবার-পানি মজুতের পরামর্শ সরকারের

যুক্তরাজ্যের পরিবারগুলোকে জরুরি পরিস্থিতির জন্য ঘরে প্রয়োজনীয় কিছু পণ্য মজুত রাখার পরামর্শ দিতে যাচ্ছে সরকার। চরম আবহাওয়া, সাইবার হামলা এবং বিদেশি রাষ্ট্রের সম্ভাব্য শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের মতো সংকট মোকাবিলায় জনগণকে আগেভাগে প্রস্তুত করার লক্ষ্যে নতুন একটি জাতীয় জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্য সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো এমন পরিস্থিতিতে পরিবারগুলোকে কিছু সময়ের জন্য নিজেদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে চলার সক্ষমতা তৈরি করা, যখন বিদ্যুৎ বা পানির সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে কিংবা জরুরি কারণে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সরকারের ধারণা, সাধারণ মানুষ কিছুটা প্রস্তুত থাকলে বড় ধরনের সংকটের সময় সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জরুরি সেবা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

প্রস্তাবিত পরামর্শের মধ্যে টিনজাত খাবার ও বোতলজাত পানি ঘরে রাখার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেতে পারে। সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র Financial Times-কে জানিয়েছে, জনগণকে আতঙ্কিত করার পরিবর্তে দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবসম্মত কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ঘরে কিছু খাবার ও পানি রাখার মতো সাধারণ প্রস্তুতিও থাকবে।

সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ব্রিটিশ অস্ত্র ও প্রযুক্তি ইউক্রেনের হাতে ব্যবহৃত হওয়া নিয়ে মস্কো ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যকে একাধিকবার সতর্ক করেছে।

সোমবার যুক্তরাজ্যে রুশ দূতাবাসের এক বিবৃতিতে ব্রিটেনের কর্মকাণ্ডের ‘পরিণতি’ ভোগ করার হুমকি দেওয়া হয়। রুশ পক্ষের দাবি, ইউক্রেনের হয়ে ব্রিটিশ-নির্মিত ড্রোন রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে এবং এর ফলে লন্ডন ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এর আগে ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে The Times জানিয়েছিল, গত ছয় মাসে দুই ব্রিটিশ কোম্পানির তৈরি ড্রোন রাশিয়ার বিভিন্ন স্থাপনায় হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ভলগোগ্রাদ ও মস্কোর আশপাশের তেল শোধনাগার এবং সরবরাহকেন্দ্র ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

রাশিয়ার এমন বক্তব্যের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর প্রস্তুতি জোরদার করছে। সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের বহিরাগত হুমকি মোকাবিলার জন্য তৈরি ‘ওয়ার বুক’ বা জাতীয় প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত নির্দেশিকাও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে চরম আবহাওয়ার মতো সংকট মোকাবিলায় জনগণের জন্য আলাদা নির্দেশনা তৈরির কাজ চলছে।

এদিকে চলতি গ্রীষ্মে যুক্তরাজ্যের নজিরবিহীন তাপপ্রবাহও সরকারের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একের পর এক তাপপ্রবাহ এবং দীর্ঘ সময়ের শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং একাধিক স্থানে দাবানলের ঘটনাও ঘটেছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী তাপ ও খরার প্রভাব কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। বিনিয়োগ ব্যাংক শোর ক্যাপিটালের বিশ্লেষকদের মতে, পরপর পাঁচটি তাপপ্রবাহ এবং দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাব কৃষকদের ফসল নষ্ট করতে পারে। এর ফলে বছরের শেষদিকে খাদ্য ঘাটতি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি আমদানির ওপর যুক্তরাজ্যের নির্ভরতা বাড়তে পারে।

National Farmers’ Union-ও পরিস্থিতিকে ক্রমেই উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘাসের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিছু দুগ্ধ খামারি ইতোমধ্যেই শীতকালীন পশুখাদ্য ব্যবহার করতে শুরু করেছেন—যা সাধারণত বছরের পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা হয়।

জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি সরকারের জাতীয় ঝুঁকি তালিকাতেও সম্প্রতি পরিবর্তন আনা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিদেশি বা অন্য ধরনের হস্তক্ষেপের ঝুঁকিকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে সরকার স্পষ্ট করেছে, এই ঝুঁকি তালিকা ভবিষ্যতে কী ঘটবে তার পূর্বাভাস নয়; বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের প্রস্তুত রাখার একটি পরিকল্পনামূলক কাঠামো।

সরকারের নতুন প্রচারাভিযানে তাই যুদ্ধের আশঙ্কার পাশাপাশি বন্যা, তাপপ্রবাহ, খরা, বিদ্যুৎ বা পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সাইবার হামলার মতো বিভিন্ন ধরনের সংকটের কথা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। সাধারণ পরিবারকে আতঙ্কিত না করে সীমিত পরিসরে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘরে কিছু দীর্ঘস্থায়ী খাবার ও পানীয় সংরক্ষণ, জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা এবং বিদ্যুৎ বা অন্যান্য পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়—এসব বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা সংকটের সময় মানুষের ওপর চাপ কমাতে পারে।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে মসজিদ রক্ষায় আসছে নতুন সুরক্ষা বিল

যুক্তরাজ্যে বিদেশি নাগরিকদের কল্যাণ সুবিধা বন্ধে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে কনজারভেটিভ পার্টি

যুক্তরাজ্যে ৬.৫ মিলিয়ন ঘরের ঘাটতি, দায়ী অভিবাসন ও আবাসন নির্মাণে ব্যর্থতা