যৌন অসদাচরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে বিতর্কের পর জনপ্রিয় রিয়েলিটি ডেটিং অনুষ্ঠান ‘ম্যারিড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকে’ আর প্রচার করবে না ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ফোর। চলতি বছরের শুরুতে ধারণ করা অনুষ্ঠানটির ষষ্ঠ মৌসুমও প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) চ্যানেল ফোরের প্রধান নির্বাহী প্রিয়া ডোগরা এ সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেন। অনুষ্ঠানটির প্রযোজনা ও প্রতিযোগীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে পর্যালোচনা পরিচালনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানটিতে অবিবাহিত নারী-পুরুষকে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে জুটি বেঁধে বিয়ের মতো সম্পর্কে যুক্ত করা হয়। চলতি বছরের মে মাসে বিবিসির অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘প্যানোরামা’তে সম্প্রচারিত এক প্রতিবেদনে দুই নারী অভিযোগ করেন, অনুষ্ঠানটির প্রযোজনার সময় তাদের ধর্ষণ করা হয়েছিল। আরেক নারী অভিযোগ করেন, তার সম্মতি ছাড়া তার সঙ্গে যৌন আচরণ করা হয়েছিল। তিনজনেরই দাবি, অনুষ্ঠানটির সম্প্রচারক চ্যানেল ফোর এবং প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিপিএল তাদের সুরক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। অভিযুক্ত তিন পুরুষ অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এসব অভিযোগের পর চলতি বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকম অনুষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ওঠা একটি অভিযোগের তদন্ত শুরু করে। অভিযোগটি ছিল ন্যায্যতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা-সংক্রান্ত।
চ্যানেল ফোরের প্রধান নির্বাহী প্রিয়া ডোগরা অভিযোগগুলো সামনে আসার পর দুটি পৃথক পর্যালোচনার উদ্যোগ নেন। এর একটিতে আইন প্রতিষ্ঠান ক্লাইড অ্যান্ড কোং অভিযোগগুলো প্রথম উত্থাপিত হওয়ার সময়কার প্রতিযোগীদের কল্যাণ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নীতিমালা এবং চ্যানেল ফোর ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিপিএলের ভূমিকা পরীক্ষা করে। অন্য পর্যালোচনাটি পরিচালনা করেন বিবিসি ওয়ানের সাবেক নিয়ন্ত্রক লোরেইন হেগেসি। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে বর্তমান নীতিমালায় কী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, তা খতিয়ে দেখেন তিনি।
চ্যানেল ফোর জানিয়েছে, এই দুই পর্যালোচনার কোনোটির উদ্দেশ্যই প্যানোরামায় প্রকাশিত গুরুতর অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা ছিল না। এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়।
আইন প্রতিষ্ঠান ক্লাইড অ্যান্ড কোংয়ের পর্যালোচনায় ৩১ হাজার ১৭২টি নথি এবং সম্প্রচারিত ও অপ্রচারিত ২০ ঘণ্টার ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, চ্যানেল ফোর ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিপিএলের প্রতিযোগীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ-সংক্রান্ত নীতিমালা অফকমের সম্প্রচার বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। অভিযোগগুলো মোকাবিলার ক্ষেত্রেও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে পর্যালোচনায় কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা ও কল্যাণ-সংক্রান্ত নীতিমালা পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি। এর মধ্যে একটি ঘটনায় কয়েকজন অংশগ্রহণকারী নিষিদ্ধ পদার্থ-সংক্রান্ত আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও তাদের অনুষ্ঠান থেকে বাদ না দিয়ে প্রথম ও চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে লোরেইন হেগেসির পর্যালোচনায় অনুষ্ঠানের কিছু বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনুষ্ঠানের কিছু পরিস্থিতি অংশগ্রহণকারীদের পরোক্ষভাবে শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় জড়াতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি প্রযোজনা দলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়লে অংশগ্রহণকারীরা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারেন, যা তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রতিবেদনে দম্পতিদের সম্পর্কের শারীরিক দিক নিয়ে কত ঘন ঘন প্রশ্ন করা হয়, তা পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘ইনটিমেসি উইক’ এবং ‘পার্টনার সোয়াপ উইক’-এর মতো বিশেষ আয়োজন বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এই পর্যালোচনার ফলাফল ও অভিযোগ ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির পর চ্যানেল ফোর অনুষ্ঠানটির নতুন মৌসুম প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে যৌন অসদাচরণ ও ধর্ষণের অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া পৃথকভাবে চলবে।
সূত্রঃ স্কাই নিউজ
এমকে

