যুক্তরাজ্যের ডানপন্থি রাজনৈতিক দল রিফর্ম ইউকে’র অভিবাসন ও বহিষ্কার নীতি নিয়ে দলটির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। দলটির স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফ এবং ট্রেজারি মুখপাত্র রবার্ট জেনরিকের বিপরীতমুখী বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় রোববার, যখন স্কাই নিউজের এক সাক্ষাৎকারে জেনরিককে প্রশ্ন করা হয়—কাউন্সিলের বাসভবনে থাকা কোনো বিদেশে জন্ম নেওয়া ব্যক্তি কি শুধুমাত্র সামাজিক আবাসনে থাকার কারণেই বহিষ্কৃত হবেন?
জবাবে জেনরিক বলেন, “শুধু সে কারণেই নয়।” তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, যদি কোনো বিদেশি নাগরিক দলটির নির্ধারিত অর্থনৈতিক মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হন—যেমন পর্যাপ্ত আয় না থাকা, কর্মঘণ্টা কম হওয়া বা চাকরিতে না থাকা—তাহলে তারা ভিসা নবায়নের সুযোগ পাবেন না এবং শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে বাধ্য হবেন।
তবে মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জিয়া ইউসুফ স্পষ্টভাবে জানান, জেনরিকের বক্তব্য দলটির আনুষ্ঠানিক নীতিকে প্রতিফলিত করে না।
তিনি বলেন, “দলের বহিষ্কার পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে আমি পরিষ্কার করতে চাই—যদি কোনো বিদেশি নাগরিক করদাতাদের অর্থে পরিচালিত সামাজিক আবাসনে বসবাস করেন, তাহলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমাদের অর্থনৈতিক পরীক্ষায় ব্যর্থ হবেন এবং তাকে বহিষ্কার করা হবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকাশ্য মতবিরোধ রিফর্ম ইউকের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের আগে এমন বিরোধ দলটির জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
রিফর্ম নেতা নাইজেল ফারাজ ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি এই নির্বাচনে জিততে “সম্ভাব্য সবকিছু” করবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, লেবার প্রার্থী অ্যান্ডি বার্নহাম ৪৩ শতাংশ সমর্থন নিয়ে সামান্য এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে রিফর্ম পেয়েছে ৪০ শতাংশ সমর্থন, আর সাবেক রিফর্ম এমপি রুপার্ট লো প্রতিষ্ঠিত নতুন দল রিস্টোর ব্রিটেন পেয়েছে ৭ শতাংশ ভোটের সমর্থন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডানপন্থি ভোট বিভক্ত হয়ে গেলে রিফর্মের জন্য বড় ধাক্কা আসতে পারে। বিশেষ করে রিস্টোর ব্রিটেন গণবহিষ্কার ও কঠোর অভিবাসন নীতিতে রিফর্মের চেয়েও কড়া অবস্থান নেওয়ায় দলটির ভোটব্যাংকে চাপ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ফারাজ এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন, অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করা প্রায় চার লাখ শরণার্থীর আশ্রয় সুবিধা বাতিল করে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে। তিনি বলেন, রিফর্ম ক্ষমতায় এলে গত পাঁচ বছরে দেওয়া সব আশ্রয় অনুমোদন পুনর্বিবেচনা করা হবে।
দলটি আরও ঘোষণা দিয়েছে, তারা ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ থেকে বেরিয়ে আসবে এবং বৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে “ওয়ান ইন-ওয়ান আউট” নীতি চালু করবে।
এদিকে কনজারভেটিভ পার্টির এক মুখপাত্র রিফর্মের অভ্যন্তরীণ এই দ্বন্দ্বকে “বিশৃঙ্খলার প্রমাণ” বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, “নাইজেল ফারাজকে এখন হয়তো জিয়া ইউসুফ ও রবার্ট জেনরিককে আলাদা করে শান্ত করতে হবে।”
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মাইক ট্যাপ বলেন, “রিফর্মের কোনো বাস্তব পরিকল্পনা নেই। তারা নিজেদের মধ্যেই বিভক্ত, আর সরকার বাস্তবে অভিবাসন কমানোর কাজ করছে।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েই রিফর্ম ইউকের উত্থান হলেও, এখন সেই একই ইস্যু দলটির ভেতরে নেতৃত্ব সংকট ও নীতিগত দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

