রাশিয়ার সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের আশঙ্কা বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবল ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার করতে নতুন জরুরি ক্ষমতা চালুর পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় জাতীয় নিরাপত্তার জরুরি পরিস্থিতিতে টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সেবা বন্ধ বা অকার্যকর করার নির্দেশ দিতে পারবেন মন্ত্রীরা। পাশাপাশি, সমুদ্রতলের কেবল যেখানে উপকূলে এসে যুক্ত হয়েছে, সেই স্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রবেশাধিকার দেওয়ার ক্ষমতাও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবল ও জ্বালানি পরিবহনের পাইপলাইনে ইচ্ছাকৃতভাবে হস্তক্ষেপের দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য আরও কঠোর শাস্তির প্রস্তাব করেছে সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছর, বেপরোয়া আচরণের জন্য ১০ বছর এবং চরম অবহেলার জন্য দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি, সীমাহীন অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের জলসীমায় সন্দেহজনক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় নিরাপত্তায় সমুদ্রতলের অবকাঠামোর গুরুত্ব বাড়তে থাকায় এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সমুদ্রতলের বিপুলসংখ্যক কেবল ও পাইপলাইন মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানাধীন ও পরিচালিত। এসব অবকাঠামোর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক তথ্য আদান-প্রদানের প্রায় সবকিছু এবং দেশটির গ্যাস সরবরাহের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পরিবাহিত হয়।
সমুদ্রতলের অবকাঠামোর ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কারণে গত বছর প্রকাশিত এক সংসদীয় প্রতিবেদনে পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা, আর্থিক সেবা ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।
যুক্তরাজ্য ও তার ন্যাটো মিত্ররা সমুদ্রের নিচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে উদ্বিগ্ন। চলতি বছরের এপ্রিলে ব্রিটিশ সরকার অভিযোগ করে, যুক্তরাজ্যের উত্তরের জলসীমায় কেবল ও পাইপলাইন ঘিরে রুশ সাবমেরিনগুলো গোপন অভিযান চালিয়েছে।
এ ছাড়া, গুপ্তচরবৃত্তিতে ব্যবহৃত জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্রতলের অবকাঠামোর অবস্থান ও বিন্যাস শনাক্ত করার অভিযোগও রাশিয়ার বিরুদ্ধে তুলেছে যুক্তরাজ্য। গত বছর ব্রিটিশ সরকার জানায়, যুক্তরাজ্যের জলসীমার কাছ দিয়ে যাওয়ার পর রয়্যাল নেভি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিচালিত বলে পরিচিত ‘ইয়ানতার’ নামের একটি সন্দেহভাজন জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছিল। রাশিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই সঙ্গে মস্কো অভিযোগ করেছে, রাশিয়াবিরোধী আতঙ্ক ছড়িয়ে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে যুক্তরাজ্য।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি নীতিপত্রে ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, সমুদ্রতলের অবকাঠামোকে প্রভাবিত করে এমন জরুরি ঘটনা মোকাবিলার জন্য বর্তমানে তাদের পর্যাপ্ত বিশেষ ক্ষমতা নেই। নৌ ও বিমান চলাচল খাতে হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকলেও সমুদ্রতলের অবকাঠামোর ক্ষেত্রে একই ধরনের ক্ষমতা নেই। জাতীয় জরুরি অবস্থায় ব্যবহারের জন্য বিদ্যমান বিস্তৃত ক্ষমতাগুলোও সংকটের সময় দ্রুত প্রয়োগের ক্ষেত্রে ধীরগতির হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট হুমকি বা ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য সরবরাহ, সেবা পরিবর্তন কিংবা তা বন্ধ করার নির্দেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলোকে দেওয়ার নতুন ক্ষমতা চালুর প্রস্তাব করেছে সরকার। এ পরিবর্তন কার্যকর করতে নতুন আইন প্রয়োজন হবে। শিল্প খাতের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে পরামর্শ প্রক্রিয়া আগামী জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার পর আইন প্রণয়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে।
সরকারি নির্দেশ অমান্যকারী কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড অথবা তাদের বৈশ্বিক বার্ষিক লেনদেনের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। সাধারণত এসব নির্দেশ প্রকাশ করা হবে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজন হলে সেগুলো গোপন রাখার সুযোগও থাকবে।
প্রস্তাবিত নতুন ক্ষমতাগুলো সরাসরি জ্বালানি অবকাঠামো পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করার পরিকল্পনা নেই। তবে এ খাতের জন্য আলাদা ক্ষমতা চালুর বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে।
ব্রিটিশ মন্ত্রীরা চান, নতুন ক্ষমতাগুলো যেন যুক্তরাজ্যের জলসীমার বাইরের সমুদ্রতলের সেবাসহ এ ধরনের অবকাঠামোর পূর্ণ পরিসরে প্রয়োগ করা যায়। যুক্তরাজ্যের আঞ্চলিক জলসীমা উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে দেশের বাইরের এলাকায় এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে বলে নীতিপত্রে স্বীকার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে অন্যান্য দেশের আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে ব্রিটেনের প্রস্তাবের সামঞ্জস্যও যাচাই করা হচ্ছে।
নীতিপত্রে আরও বলা হয়েছে, সমুদ্রতলের অবকাঠামো নিয়ে ব্রিটেনের বিদ্যমান কিছু আইন ভিক্টোরীয় যুগের। ওই আইনগুলো মূলত টেলিগ্রাফের তারের সুরক্ষার জন্য তৈরি হয়েছিল। আধুনিক ফাইবার-অপটিক কেবলে নাশকতা বা ক্ষতিসাধনের ঘটনায় এসব আইন প্রয়োগ করা যাবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর সমুদ্রতলের কেবল ও পাইপলাইনের ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতার প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সরকারের নতুন উদ্যোগটি নেওয়া হচ্ছে।
সূত্রঃ বিবিসি
এমকে

