TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

লন্ডনে জন্ম, তবু ১৫ বছর নাগরিকত্বহীনঃ ব্রিটিশ ব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতা

লন্ডনে জন্ম নেওয়া অলু সোভেমিমো প্রায় ১৫ বছর ধরে ব্রিটিশ নাগরিকত্বহীন অবস্থায় বসবাস করেছেন—যে দেশ ছাড়া তিনি আর কিছুই চেনেন না। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে না পাওয়ার কারণে তিনি বছরের পর বছর আটক ও বিতাড়নের আশঙ্কায় দিন কাটিয়েছেন। তার অভিজ্ঞতা ব্রিটেনের নাগরিকত্ব ব্যবস্থার জটিলতা ও মানবিক সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে।

 

১৯৯১ সালে লন্ডনের সেন্ট গাই’স হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন অলু সোভেমিমো। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দক্ষিণ লন্ডনে, স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করেছেন, নিজেকে বরাবরই ব্রিটিশ বলে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু ২০ বছর বয়সে ব্রিটিশ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে গিয়ে জানতে পারেন—আইনগতভাবে তিনি ব্রিটিশ নাগরিক নন। এই খবর তার ও তার পরিবারের জন্য ছিল ভয়াবহ ধাক্কা।

অলুর মা নাইজেরিয়া থেকে যুক্তরাজ্যে আসেন এবং তার জন্মের সময় বৈধ ভিসায় থাকলেও স্থায়ী বসবাসের অধিকার তখনো পাননি। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজে এবং নাইজেরিয়ায় জন্ম নেওয়া বড় ছেলের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব অর্জন করলেও, যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া ছোট ছেলে অলু সেই সুবিধা পাননি। এই বাস্তবতা অনেক অভিবাসী পরিবারের জন্যই অজানা থেকে যায়।

নাগরিকত্ব না থাকার বিষয়টি অলুর জীবনে গভীর মানসিক প্রভাব ফেলে। তিনি সব সময় ভয় নিয়ে চলতেন—কাজ করা বৈধ কি না, হঠাৎ গ্রেপ্তার বা ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হবে কি না। যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া মানুষদেরও আটক হওয়ার খবর তাকে আরও আতঙ্কিত করে তোলে। প্রতিদিন কমিউনিটিতে কাজ করলেও মনে মনে ভাবতেন—আজই কি সেই দিন, যেদিন তাকে বিতাড়ন করা হবে।

কৈশোরে একটি অপরাধী চক্রের প্রভাবে জড়িয়ে পড়ায় অলুর জীবনে আরও জটিলতা তৈরি হয়। ১৬ বছর বয়সে গ্রেপ্তার ও কারাবরণের ঘটনা পরবর্তী সময়ে তার নাগরিকত্ব আবেদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যদিও তিনি কারামুক্তির পর জীবন পাল্টে যুবকর্মে যুক্ত হন এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সহায়তা করতে শুরু করেন, তবুও ‘ভালো চরিত্র’ শর্ত দেখিয়ে প্রথম দফায় তার নাগরিকত্ব আবেদন প্রত্যাখ্যান করে হোম অফিস।

যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য নাগরিকত্ব পাওয়ার একটি আইনগত পথ রয়েছে। দেশটিতে টানা ১০ বছর বসবাসকারী শিশুরা ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে নিবন্ধনের অধিকার রাখে। তবে এই প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল এবং ‘ভালো চরিত্র’ শর্তের কারণে বহু শিশু ও তরুণ নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের মতো একই মানদণ্ড শিশুদের ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে।

দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর শিশু নাগরিকত্ব নিয়ে কাজ করা সংগঠন PRCBC-এর সহায়তায় অবশেষে ২০২৪ সালে অলু সোভেমিমো ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পান। ৩২ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো তিনি ব্রিটিশ পাসপোর্ট হাতে পান এবং নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। আইনি স্বীকৃতি পাওয়ার পরই তিনি জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন।

তবে নাগরিকত্ব পাওয়ার আনন্দের সঙ্গে রয়ে গেছে ক্ষোভ ও বেদনা। অলু প্রশ্ন তোলেন—যে দেশে জন্ম, বেড়ে ওঠা ও সমাজের জন্য কাজ করেছেন, সেই দেশের নাগরিকত্ব পেতে কেন তাকে জীবনের এতগুলো বছর অনিশ্চয়তায় কাটাতে হলো। তার মতে, এই ব্যবস্থা মানুষকে নিজের পরিচয় নিয়েই সন্দেহ করতে বাধ্য করে।

বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাজ্যে প্রস্তাবিত নতুন অভিবাসন নীতির ফলে ভবিষ্যতে আরও বেশি শিশু এমন নাগরিকত্বহীন অবস্থায় বড় হবে। অলু সোভেমিমোর গল্প সেই সম্ভাব্য সংকটের একটি বাস্তব ও মানবিক উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

হোম অফিস কর্তৃক আশ্রয়প্রার্থীদেরকে হয়রানি

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাজ্যের হিথ্রোতে ডিজিটাল লেনঃ পাসপোর্ট কন্ট্রোলে এআই ক্যামেরায় যাত্রী যাচাই

রুয়ান্ডায় মানবাধিকার কর্মী প্রবেশে বাঁধা দেয়ায় প্রশ্নের মুখে যুক্তরাজ্যের রুয়ান্ডানীতি