ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নতুন নেতা অ্যান্ডি বার্নহামকে ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক। দলটির এক জ্যেষ্ঠ সূত্র তাকে “লিঙ্গগত পরিচয় ছাড়া সব দিক থেকে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী” হিসেবে বর্ণনা করার পর কনজারভেটিভ পার্টি, নারী অধিকারকর্মী এবং লেবারের নারী সংসদ সদস্যদের একাংশের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক এক রাজনৈতিক ব্রিফিংয়ে লেবারের ওই জ্যেষ্ঠ সূত্র দাবি করেন, অ্যান্ডি বার্নহামের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পারিবারিক অর্থনীতি, সামাজিক পরিচর্যা, নিরাপদ সড়ক এবং শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত। তার ভাষায়, এটি একটি “স্পষ্ট নারীকেন্দ্রিক কর্মসূচি”।
সূত্রটি আরও বলেন, নারী উপদেষ্টা ও সমর্থকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা বার্নহাম ঐতিহ্যগতভাবে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত বিষয়গুলোতে বেশি আগ্রহী। সে কারণে তিনি “লিঙ্গ ছাড়া সব অর্থে লেবারের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী” হতে পারেন বলে মন্তব্য করেন।
এই মন্তব্য প্রকাশের পরই কনজারভেটিভ পার্টির নেত্রী কেমি ব্যাডেনক তীব্র কটাক্ষ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, “লেবার তাদের নেতা পরিবর্তন করেছে, কিন্তু তারা এখনও নারী বলতে কী বোঝায় তা বুঝতে পারেনি।”
বিষয়টি নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন কনজারভেটিভ পার্টির সমতা বিষয়ক মুখপাত্র ক্লেয়ার কৌতিনহোও। তিনি বলেন, “আমি তো ভেবেছিলাম জ্বালানি, অর্থনীতি কিংবা প্রতিরক্ষা নিয়ে আমি কেবল তখনই চিন্তা করি, যখন পুরুষদের মুগ্ধ করতে চাই।”
প্রখ্যাত ব্রিটিশ লেখক ও নারী অধিকারকর্মী জে কে রাউলিংও এ মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “লেবার পার্টি অবশেষে এমন একজন ‘নারী’ খুঁজে পেয়েছে, যাকে তারা নেতা হিসেবে দেখতে চায়। তিনি একজন পুরুষ, যাকে ‘লিঙ্গ ছাড়া সব ক্ষেত্রে নারী প্রধানমন্ত্রী’ বলা হচ্ছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, কেউ এটি প্রকাশ্যে বলাকে ভালো ধারণা মনে করেছে।”
বিতর্কটি লেবার পার্টির অভ্যন্তরেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেটের সংসদ সদস্য টিউলিপ সিদ্দিক বলেন, “আমাদের দলের নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় কোনো নারী প্রার্থী না থাকায় আমি আগেই হতাশ ছিলাম। তার ওপর এমন অবমাননাকর মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।”
মিল্টন কেইনসের সংসদ সদস্য এমিলি ডার্লিংটন বলেন, “এ ধরনের মন্তব্য দেখিয়ে দেয় যে রাজনীতিতে নারীরা এখনও কী ধরনের মানসিকতার মুখোমুখি হন। নারীরা যে কোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারি দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে সক্ষম।”
এদিকে সমালোচকরা উল্লেখ করছেন, বার্নহামের সম্ভাব্য প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদেই পুরুষদের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। তার সম্ভাব্য প্রধান দপ্তর সচিব, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবং শীর্ষ অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী পদগুলোর জন্য আলোচিত অধিকাংশ ব্যক্তিই পুরুষ।
বর্তমান অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস, যিনি লেবারের প্রথম নারী অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাকেও দায়িত্ব পরিবর্তনের মুখে পড়তে হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা রয়েছে।
তবে বিতর্কিত মন্তব্য থেকে দ্রুত দূরত্ব তৈরি করেছে বার্নহামের ঘনিষ্ঠ মহল। তার এক সহযোগী বলেন, “এই ধরনের উপস্থাপন হাস্যকর, সেকেলে এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন। লেবার পার্টিতে অসংখ্য মেধাবী নারী রয়েছেন এবং অ্যান্ডি তাদের সমর্থন পেয়ে গর্বিত।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিতর্ক ব্রিটিশ রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব, লিঙ্গভিত্তিক ধারণা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে নতুন রাজনৈতিক বাকযুদ্ধেরও সূত্রপাত করেছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

