সিরিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শারমিনা বেগমকে। ২০১৪ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে ব্রিটেন থেকে সিরিয়ায় গিয়ে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএসে যোগ দেওয়া শারমিনা পরবর্তীতে শামিমা বেগমসহ বেথনাল গ্রিন একাডেমির আরও কয়েকজন স্কুলছাত্রীর সিরিয়ায় যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক জার্মান সংবাদ প্রতিবেদনে তার গ্রেপ্তারের তথ্য উঠে এসেছে।
জার্মান সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পূর্ব লন্ডন থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর শারমিনা তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় পৌঁছান এবং আইএসের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় যান। পরবর্তী সময়ে তার স্কুলের সহপাঠী শামিমা বেগম, আমিরা আবাসে ও খাদিজা সুলতানা সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দেন। তাদের চারজনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা মহলে আলোচনা রয়েছে।
সাম্প্রতিক তদন্তে শারমিনার নাম আবার সামনে আসে জার্মানির বার্লিনে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে বা প্রাইড অনুষ্ঠানে হামলার তদন্তের সূত্র ধরে। জার্মান তদন্তকারীরা হামলার সন্দেহভাজন আবদুল বল্লুতের মোবাইল ফোনে শারমিনার সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পেয়েছেন বলে জার্মান সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, হামলার কয়েক দিন আগেও তাদের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছিল।
তবে এখন পর্যন্ত তদন্তকারীরা শারমিনাকে হামলার পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা বা হামলায় সরাসরি জড়িত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। জার্মান সংবাদমাধ্যম টাগেসশপিগেল জানিয়েছে, তদন্তকারীরা তাকে আবদুল বল্লুতের ‘ইন্সট্রাক্টর’ বা নির্দেশদাতা হিসেবে দেখছেন না।
২৫ জুলাই বার্লিনের টিয়ারগার্টেন এলাকায় ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে অনুষ্ঠানের কাছে একটি গাড়ি মানুষের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে। পরে সন্দেহভাজন হামলাকারী গাড়ি থেকে বের হয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আরও কয়েকজনকে আক্রমণ করে পালিয়ে যায়। হামলায় একজন নারী নিহত এবং অন্তত ২৯ জন আহত হন। পরদিন পুলিশ অভিযান চালিয়ে আবদুল বল্লুতকে গুলি করে হত্যা করে। জার্মান কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে তদন্ত করছে।
হামলার তদন্তে বল্লুতের মোবাইল ফোন থেকে একটি কথিত দায় স্বীকারের ভিডিওও উদ্ধার করা হয় বলে জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম ডব্লিউডিআর ও জুডডয়চে জাইটুংয়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিডিওটি একজন ব্রিটিশ ইসলামপন্থী নারীর কাছে পাঠানো হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
শারমিনার অতীত নিয়েও নতুন করে তথ্য সামনে এসেছে। আইএসের পতনের পর ২০১৯ সালে তিনি উত্তর সিরিয়ার আল-হোল শিবিরে কুর্দি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ২০২২ সালে তিনি শিবির থেকে পালিয়ে যান বলে জানা গেছে। এরপর সিরিয়ায় আত্মগোপনে থেকে ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করতেন বলেও জার্মান প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে অনলাইনের মাধ্যমে জিহাদিদের জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং আইএসের প্রচারণা ছড়ানোর অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় থাকা ইসলামপন্থীদের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ তদন্তকারীদের সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এখনো প্রকাশ্যে নেই।
শারমিনার বাবা জানিয়েছেন, মেয়েকে গ্রেপ্তারের খবর তিনি আগে জানতেন না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিটিশ পুলিশ বা সরকার তার মেয়ের অবস্থান সম্পর্কে তাকে কোনো তথ্য দেয়নি। মেয়েকে জীবিত অবস্থায় পাওয়ার খবর তাকে আবেগাপ্লুত করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে শারমিনার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব কয়েক বছর আগেই বাতিল করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ফলে তাকে ব্রিটেনে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের ওপর স্বাভাবিক নাগরিক প্রত্যাবাসনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
সিরিয়ায় শারমিনার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে বার্লিন প্রাইড হামলার তদন্তে জার্মান কর্তৃপক্ষ তার কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে তাকে জার্মানিতে নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
শারমিনার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালে বেথনাল গ্রিন একাডেমি থেকে সিরিয়ায় যাওয়া চার স্কুলছাত্রীর বিষয়ে নতুন তথ্য সামনে এলো। শামিমা বেগম বর্তমানে উত্তর সিরিয়ার আল-রোজ শিবিরে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আমিরা আবাসে ও খাদিজা সুলতানা সিরিয়ায় মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়।
শামিমা বেগম নিজেও বর্তমানে ব্রিটেনে ফেরার জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তার আইনজীবীদের দাবি, মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাকে যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে সিরিয়ায় পাচার করা হয়েছিল এবং সেখানে পৌঁছানোর অল্প সময়ের মধ্যেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক আইএস যোদ্ধার সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া হয়। তবে ব্রিটিশ আদালতে তার নাগরিকত্ব বাতিল ও যুক্তরাজ্যে ফেরার অধিকার নিয়ে আগের আইনি চ্যালেঞ্জগুলো সফল হয়নি।
শারমিনা বেগমকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সিরিয়ায় তার বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বার্লিন প্রাইড হামলার তদন্তে তার সঙ্গে আবদুল বল্লুতের যোগাযোগের প্রকৃতি কী ছিল। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলেও হামলার পরিকল্পনায় তার সরাসরি ভূমিকার প্রমাণ তদন্তকারীরা প্রকাশ করেননি।
সূত্রঃ টাগেসশপিগেল \ ডেইলি মেইল
এমকে

