15.1 C
London
June 9, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাজ্যে এসে সামাজিক সেবা খাতে পূর্ণকালীন কাজের অভিযোগঃ তদন্তের দাবি

শিক্ষার্থী ভিসার অপব্যবহার করে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের একটি অংশ যুক্তরাজ্যের সামাজিক সেবা খাতে পূর্ণকালীন চাকরিতে যুক্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নর্থ ইস্টভিত্তিক শিক্ষণ-প্রতিবন্ধী সহায়তা প্রদানকারী দাতব্য সংস্থা ‘জার্নি’ দাবি করেছে, বিশেষ করে নাইজেরিয়া থেকে আসা কিছু স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও নিয়মিত ক্লাসে অংশ না নিয়ে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সামাজিক সেবা খাতে কাজ করছেন।

সংস্থাটির অভিযোগ, অনেক শিক্ষার্থী তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনীতি, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বিষয়ে অধ্যয়নরত থাকলেও তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান থেকে শত শত মাইল দূরে বসবাস করে সামাজিক সেবা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করছেন। যা শিক্ষার্থী ভিসার শর্ত অনুযায়ী শিক্ষাকালীন সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজের সীমা লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।

জার্নির প্রধান নির্বাহী এলস্পেথ ম্যাকফারসন দাবি করেন, তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বেশ কয়েকজন আবেদনকারীকে শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের জমা দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে অসঙ্গতি ও সম্ভাব্য জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে নাইজেরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সংস্থাটির তথ্যমতে, এক আবেদনকারী টিসাইড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়নরত থাকা অবস্থায় সামাজিক সেবা খাতে স্থায়ী পূর্ণকালীন চাকরির জন্য আবেদন করেন। যদিও তার পেশাগত অভিজ্ঞতা ছিল নির্মাণ খাতে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত আরেক শিক্ষার্থীর জীবনবৃত্তান্তে দেখা যায়, কোর্স শুরুর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সামাজিক সেবা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলেন। ওই আবেদনকারীর দেওয়া একটি সুপারিশপত্রের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এলস্পেথ ম্যাকফারসনের ভাষ্য অনুযায়ী, জটিল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা বা বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনেকের মধ্যেই অনুপস্থিত। তবুও কিছু নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এসব ব্যক্তিকে দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিচ্ছে, যা সেবাগ্রহীতাদের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

তিনি আরও দাবি করেন, কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহায়ক কর্মীদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সেবাগ্রহীতাকে একা রেখে বাইরে চলে যাওয়া কিংবা দায়িত্ব পালনের সময় অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের মতো ঘটনাও রয়েছে।

জার্নির প্রধান নির্বাহী বলেন, “এতে সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু, তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠক্রমে সম্পৃক্ততা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করছে কি না।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য সরকার ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। দেশটির অভিবাসন ও নাগরিকত্ব বিষয়ক মন্ত্রী মাইক ট্যাপ বলেন, “যুক্তরাজ্য প্রকৃত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাবে। তবে ভিসা ব্যবস্থা যেন অবৈধ কর্মসংস্থান বা আশ্রয় আবেদনের বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।”

তিনি জানান, গত এক বছরে শিক্ষার্থী ভিসাধারীদের আশ্রয় আবেদন ৩০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, যারা ব্যবস্থার অপব্যবহারের চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার পিছপা হবে না।

সরকার আগামী বছরের গ্রীষ্ম থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিয়োগকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন “ট্রাফিক লাইট” মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় দায়িত্বশীলভাবে শিক্ষার্থী নিয়োগে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হবে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিয়োগের অধিকারও হারাতে পারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

তবে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জানিয়েছে, তারা ভিসা পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে থাকে।

সান্ডারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, শুধুমাত্র প্রকৃত শিক্ষার্থী এবং যাদের যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে, তাদেরই ভিসা পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়। নিয়মিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শনেও বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেছে বলে তিনি দাবি করেন।

টিসাইড বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হবে।

একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে গ্লুচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ও। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও ভিসা-সংক্রান্ত দায়বদ্ধতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এসব শর্ত পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা খাত বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করলেও ভিসা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সামাজিক সেবা খাতে কর্মরতদের যোগ্যতা নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ভিসা অপব্যবহারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তও সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রিটেনের রানির কাছে ভ্যাকসিন চেয়ে নেপালের চিঠি

আবাসন সংকট মোকাবিলায় নতুন লন্ডন প্ল্যান, সহজ হচ্ছে নির্মাণ অনুমোদনের নিয়ম

চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসকে হস্তান্তর করবে ব্রিটেন, ট্রাম্প বললেন ‘চরম বোকামি’