ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সতর্কতা উপেক্ষা করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরামর্শে ট্রাম্প ইরানে পূর্ণমাত্রার হামলার সিদ্ধান্ত নেন বলে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে তৎকালীন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডকে ডেকে পাঠান। উদ্দেশ্য ছিল ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো কতটা যুক্তিযুক্ত হবে, সে বিষয়ে গোয়েন্দা মূল্যায়ন জানা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্যাবার্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন—ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যা করা হলে আরও কঠোরপন্থী এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে আগ্রহী একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে। একই সঙ্গে ইরান হরমুজ প্রণালির চলাচল বন্ধ করে দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
গোয়েন্দা সংস্থার আশঙ্কা ছিল, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং দেশটির মিত্রদের ওপরও হামলা চালাতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, প্রতিশ্রুতি এবং মিত্রদের কাছে ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হওয়ার ঝুঁকি ছিল।
শুধু গোয়েন্দা সংস্থাই নয়, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও ট্রাম্পকে যুদ্ধের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছিলেন যে যুদ্ধের ফলে প্রাণহানি বাড়বে, অস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ পড়বে এবং ইতিমধ্যে চাপের মধ্যে থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে এসব সতর্কতা সত্ত্বেও ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর পরামর্শ গ্রহণ করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি ইরানের জনগণকে তাদের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান।
ট্রাম্প শুরুতে যুদ্ধটি ছয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু সেই সময়সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। প্রায় ছয় মাস পরও সংঘাতের অবসানের কোনো স্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না।
যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দেশটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। নিহত আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়া সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন ইরানি সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকারের কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এখন পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত হওয়াকে সম্ভাব্য বিজয় হিসেবে উপস্থাপনের কথা ভাবছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
যুদ্ধের মানবিক ও সামরিক মূল্যও বাড়ছে। সামরিক অভিযানে প্রায় তিন হাজার ইরানি এবং ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, আরও ৭৫৬ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেলের মজুত কমেছে এবং গোলাবারুদের ভান্ডারেও চাপ তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পড়ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সম্ভাবনাকে চাপে ফেলছে। এর মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার সূচকও তাঁর বর্তমান প্রেসিডেন্ট মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি চুক্তি করা, যার মাধ্যমে অনির্দিষ্টকালের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ রাখা যাবে এবং একই সঙ্গে নিজেকে একজন সফল যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সেই লক্ষ্য পূরণের পথকে ক্রমেই কঠিন করে তুলেছে।
নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের উপপ্রধান এরিক ব্রিউয়ার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিটি দিকই আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিল এবং এসব ঝুঁকি আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তবে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, পেন্টাগন প্রেসিডেন্টকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নিরপেক্ষ ও সঠিক তথ্য সরবরাহ করেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম দিকে ট্রাম্পের মধ্যে আত্মবিশ্বাস দেখা গেলেও পরে সেই অবস্থানে পরিবর্তন আসে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি হামলায় আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবর ট্রাম্পকে জানানো হলে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে উপস্থিত অতিথিদের তা জানানোর নির্দেশ দেন। এতে মার-এ-লাগোর তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে করতালি ও উল্লাস শুরু হয়।
কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি, প্রাণহানি এবং অস্থিতিশীল জ্বালানি বাজার পরিস্থিতি দ্রুতই সেই উচ্ছ্বাসকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়েও ট্রাম্প পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৭ জুন পরিস্থিতিতে সাময়িক অগ্রগতি আসে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং এর মাধ্যমে ৬০ দিনের পারমাণবিক আলোচনার পথ তৈরি হয়। কিন্তু চুক্তির পরপরই তেহরান আবার হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা শুরু করলে পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প বিষয়টিকে নিজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেন। শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক আলোচনার ৬০ দিনের সময়সীমা ১৭ আগস্ট শেষ হয়ে যায়। এর তিন দিন পর অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, ট্রাম্প ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় ইরান সরকারের পতন ঘটাতে অর্থনৈতিক চাপের কৌশল গ্রহণ করেছেন।
সূত্রঃ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট\ দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
এম.কে

