সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় নিজ বাসায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন প্রবীণ ব্যবসায়ী হাজী আব্দুস সাত্তার মিয়া, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং তাদের গৃহপরিচারিকা। বুধবার সকালে ১১১ নম্বর বাসা থেকে তিনজনের গলাকাটা ও রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের পর এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত শুরু করেছে।
নিহতদের মধ্যে হাজী আব্দুস সাত্তার মিয়ার বয়স ৯০ বছর এবং তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের বয়স ৭৫ বছর বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে থাকা গৃহপরিচারিকার বয়স ২৫ বছর বলে জানা গেছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের কয়েকটি প্রতিবেদনে নিহতদের নাম ও বয়সের তথ্যে অসঙ্গতি রয়েছে; পুলিশের আনুষ্ঠানিক তদন্তে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যাবে।
ঘটনাটি ঘটে রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসায়। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে সিলেট মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত হন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আব্দুস সাত্তার মিয়া এলাকায় একজন প্রবীণ ও সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং চেম্বার অব কমার্সের সদস্যও ছিলেন।
নিহত দম্পতির পারিবারিক পরিস্থিতিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাদের চার সন্তানের মধ্যে দুজন লন্ডনে এবং দুজন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন বলে পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ফলে দেশে থাকা বৃদ্ধ দম্পতি মূলত নিজেদের বাসাতেই থাকতেন এবং তাদের সঙ্গে একজন গৃহপরিচারিকা থাকতেন। নিহত দম্পতির ভাগনে মুন্না মিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, বাসায় ওই দম্পতির সঙ্গে একজন কাজের মেয়ে থাকতেন।
হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো বাসার নিরাপত্তা ক্যামেরা নিয়ে পাওয়া তথ্য। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না এবং এ কারণে বাসাটির সিসিটিভি ক্যামেরা সচল ছিল না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আগেই কেউ বাসায় প্রবেশ করে থাকতে পারে। তবে এটি এখনো পুলিশের প্রাথমিক ধারণা—তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
পুলিশ জানিয়েছে, আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিহতদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হবে। হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে কারা ওই এলাকায় এসেছিলেন, সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা যানবাহনের উপস্থিতি ছিল কি না এবং নিহতদের সঙ্গে কারও বিরোধ বা আর্থিক লেনদেনের বিষয় ছিল কি না—এসব দিকও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
ঘটনাস্থল থেকে এখন পর্যন্ত হত্যায় ব্যবহৃত কোনো ছুরি বা অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। ফলে হত্যাকাণ্ডের ধরন, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং হত্যার পর সেটি ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামতই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তদন্তে পুলিশ ছাড়াও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করছে। ঘটনাস্থলে আলামত সংগ্রহ, মরদেহের সুরতহাল এবং অন্যান্য আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। সিলেট মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
তবে এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশ কোনো নিশ্চিত তথ্য দেয়নি। এটি ডাকাতি, ব্যক্তিগত বিরোধ, সম্পত্তি বা আর্থিক বিষয়, পরিচিত কারও সঙ্গে বিরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণে ঘটেছে কি না—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনজনকে কেন এবং কী পরিস্থিতিতে হত্যা করা হলো, ঘাতক বা ঘাতকেরা কীভাবে বাসায় প্রবেশ করল এবং কীভাবে ঘটনাস্থল ত্যাগ করল—এসব প্রশ্নের উত্তরও এখনো অজানা।
বিশেষ করে বৃদ্ধ দম্পতির বয়স এবং তাদের সঙ্গে মাত্র একজন গৃহপরিচারিকা থাকার বিষয়টি তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। হত্যাকারীরা আগে থেকেই বাসার বাসিন্দাদের চলাফেরা সম্পর্কে জানত কি না, নাকি আকস্মিকভাবে সেখানে প্রবেশ করেছিল—এটি নির্ধারণে স্থানীয়দের বক্তব্য, পারিবারিক যোগাযোগ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হবে বলে জানা গেছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়নি। তদন্তের শুরুতেই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী না করার বিষয়েও সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণের পরই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
এদিকে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় শোক ও আতঙ্ক নেমে এসেছে। ১১১ নম্বর বাসার সামনে স্থানীয় বাসিন্দা ও সংবাদকর্মীদের ভিড় জমে যায়। একজন প্রবীণ ব্যবসায়ী ও তার স্ত্রীসহ একই বাসায় তিনজনের এমন নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত মাত্র শুরু হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া প্রতিটি আলামত, আশপাশের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের তথ্য যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়েই কি ঘাতক বাসায় ঢুকেছিল, নাকি হত্যার পরিকল্পনা ছিল আরও আগে থেকেই? তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
সূত্রঃ বহুমাত্রিক
এম.কে

