20.5 C
London
October 6, 2026
TV3 BANGLA
মুক্তমতযুক্তরাজ্য (UK)

স্থায়ী বসবাসের পথ (ILR – Earned Settlement) যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক তৈরি করছে

নাশীত রহমান || লন্ডন || ০৬ অক্টোবর ২০২৬

 

স্থায়ী বসবাস বা Indefinite Leave to Remain (ILR)–এর যোগ্যতা অর্জনের পথকে পুনর্গঠন করার যে পরিকল্পনা সামনে এসেছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে Earned Settlement। সরকারের ভাষায়, স্থায়ী বসবাস আর স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়; এটি হবে “earned”—অর্থাৎ ব্যক্তির অবদান, আচরণ, কমিউনিটি অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিগত যোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। ধারণাটি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে এটি অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য অনিশ্চয়তা, জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির এক নতুন পর্ব তৈরি করছে।

এই প্রস্তাবিত নীতির ওপর ইমিগ্রেশন ল’ প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশন (ILPA) একটি বিশদ ব্রিফিং প্রকাশ করেছে, যেখানে তারা নীতির সম্ভাব্য প্রভাব, আইনি প্রশ্ন এবং মানবিক বাস্তবতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, Earned Settlement অভিবাসন ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোকে এমনভাবে বদলে দিতে পারে, যা হাজার হাজার পরিবারকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেবে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হলো ILR‑এর যোগ্যতা অর্জনের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে দশ বছর করা। সময়সীমা দ্বিগুণ হলে অভিবাসী পরিবারগুলোকে আরও দীর্ঘ সময় ভিসা নবায়ন, স্বাস্থ্য সারচার্জ এবং প্রশাসনিক জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। নিম্ন আয়ের পরিবার, কেয়ারগিভার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা গৃহস্থালি সহিংসতার শিকারদের জন্য এই অতিরিক্ত চাপ প্রায় অতিক্রম‑অযোগ্য হয়ে উঠবে। ILPA বলছে, এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক বোঝা বাড়াবে না, বরং মানুষের জীবনের স্থিতিশীলতাকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

 

 

সরকার বলছে, স্থায়ী বসবাস হবে “earned”—অর্থাৎ ব্যক্তির অবদান, আচরণ এবং কমিউনিটি অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু ILPA সতর্ক করেছে যে এই মানদণ্ডগুলো অস্পষ্ট এবং পরিমাপযোগ্য নয়। কোন অবদানকে যথেষ্ট ধরা হবে, কোন আচরণকে অযোগ্যতা হিসেবে গণ্য করা হবে, কমিউনিটি অংশগ্রহণের মানদণ্ড কী—এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। ফলে সিদ্ধান্তগ্রহণে বৈষম্য এবং অসঙ্গতির ঝুঁকি বাড়বে।

আরও বড় উদ্বেগ হলো রেট্রোস্পেকটিভ পরিবর্তনের আশঙ্কা। যারা ইতিমধ্যে পাঁচ বছরের রুটে আছেন—বিশেষ করে ২০২২–২০২৩ সালে আগতরা—তাদের ওপর নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হলে তা হবে আইনি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। নিয়ম পরিবর্তনের মৌলিক নীতি হলো, তা ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্য হবে। ILPA বলছে, রেট্রোস্পেকটিভ পরিবর্তন হাজার হাজার পরিবারকে আইনি ও মানসিক সংকটে ফেলবে এবং তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণভাবে অনিশ্চিত করে তুলবে।

সরকার বলেছে যে ট্রানজিশনাল সুরক্ষা থাকবে, কিন্তু কীভাবে থাকবে তা স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতা অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে। ILPA বলছে, নীতি ঘোষণার আগে ট্রানজিশনাল সুরক্ষা স্পষ্ট করা জরুরি, নইলে মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত থাকবে।

 

 

দশ বছরের রুট পরিবারগুলোর ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শিশুদের স্কুলিং, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা Article 8 (পরিবার জীবন) এবং Article 3 (মানবিক মর্যাদা) অধিকারকে দুর্বল করে দিতে পারে। ILPA বলছে, Earned Settlement পরিবার‑কেন্দ্রিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অর্থনৈতিক অবদান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বৈষম্যের সম্ভাবনাও স্পষ্ট। নিম্ন আয়ের মানুষ, কেয়ারগিভার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা গৃহস্থালি সহিংসতার শিকাররা অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হতে পারেন। অর্থনৈতিক অবদানকে একমাত্র মানদণ্ড করলে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। সিদ্ধান্তগ্রহণে ব্যক্তিগত মতামত প্রভাব ফেলতে পারে, যা বৈষম্য ও অসঙ্গতির ঝুঁকি বাড়ায়।

Home Office ইতিমধ্যেই ব্যাকলগে জর্জরিত। দশ বছরের রুট মানে আরও বেশি আবেদন, আরও বেশি মূল্যায়ন এবং আরও বেশি জটিলতা। ILPA বলছে, নতুন নীতি প্রশাসনিকভাবে অকার্যকর এবং ব্যাকলগ আরও বাড়াবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা মানুষকে স্থায়ী চাকরি, বাড়ি কেনা বা ব্যবসা শুরু—সবকিছুতেই বাধা দেবে। এটি সরকারের ঘোষিত “integration” লক্ষ্যকে ব্যাহত করবে।

শিশুদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। দশ বছরের রুটে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা শিশুরা নাগরিকত্বের পথে বিলম্ব, শিক্ষায় বাধা এবং মানসিক চাপের মুখোমুখি হবে। দক্ষ কর্মীদের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা বাড়বে—চাকরি পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।

 

 

যুক্তরাজ্যের হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদ যে Earned Settlement নীতি ঘোষণা করেছেন, তা অভিবাসন ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এই নীতির অধীনে স্থায়ী বসবাস বা Indefinite Leave to Remain (ILR) আর পাঁচ বছরে নয়—বরং দশ বছরের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অর্জন করতে হবে। শুধু সময়সীমা বাড়ানোই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হবে আরও কঠোর শর্ত, যেমন ব্যক্তিগত আচরণ, অর্থনৈতিক অবদান, কমিউনিটি অংশগ্রহণ এবং সামাজিক দায়িত্বশীলতার মতো মানদণ্ড। এরপরই মিলবে ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আবেদন করার সুযোগ।

সরকারের ভাষায়, স্থায়ী বসবাস আর স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়; এটি হবে “earned”—অর্থাৎ অর্জিত মর্যাদা। কিন্তু এই ঘোষণার পরপরই নীতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। লেবার পার্টির ভেতরে, বিশেষ করে ব্যাকবেঞ্চ এমপিদের মধ্যে, নীতিটি নিয়ে স্পষ্ট অস্বস্তি দেখা গেছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতিটি বাস্তবায়ন হবে কি না—তা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলে আছে।

Earned Settlement ঘোষণার পর লেবার পার্টির তৃণমূল কর্মী, স্থানীয় কাউন্সিলর, অভিবাসন অধিকারকর্মী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। অনেকেই বলছেন, এই নীতি লেবারের ঐতিহ্যগত মানবিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা সাধারণত কনজারভেটিভ পার্টির পরিচিত অবস্থান; তাই লেবার সরকারের এমন সিদ্ধান্তে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্ময় ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

লেবার পার্টির বহু এমপি প্রকাশ্যে বলেছেন যে নীতিটি বাস্তবায়িত হলে হাজার হাজার পরিবার দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। দশ বছরের রুট মানে দ্বিগুণ ভিসা ফি, দ্বিগুণ স্বাস্থ্য সারচার্জ, এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা। নিম্ন আয়ের পরিবার, কেয়ারগিভার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা গৃহস্থালি সহিংসতার শিকারদের জন্য এটি হবে প্রায় অতিক্রম‑অযোগ্য বাধা। অনেক এমপি মনে করেন, এই নীতি লেবারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

 

তৃণমূল লেবার কর্মীদের প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র। স্থানীয় শাখাগুলোতে নীতির বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস হয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা দেখা গেছে, এবং অভিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে যে Earned Settlement অভিবাসীদের জীবনে অযথা অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ বাড়াবে। অনেকেই মনে করেন, এই নীতি লেবার সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে।

নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। যদিও হোম সেক্রেটারি নীতিটি এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী এবং ক্যাবিনেটের অন্যান্য সদস্যরা এখনো প্রকাশ্যে কোনো চূড়ান্ত অবস্থান জানাননি। ফলে Earned Settlement বাস্তবায়িত হবে কি না—তা এখনো নিশ্চিত নয়। লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ বিরোধ, তৃণমূলের চাপ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনা নীতির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

Earned Settlement নীতি অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও কঠিন, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত করে তুলতে পারে—এমন সতর্কবার্তা এসেছে বিভিন্ন সংগঠন থেকে। নীতিটি বাস্তবায়িত হলে পরিবার, শিশু, কর্মজীবী মানুষ এবং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। লেবার পার্টির ভেতরে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে জানায়—নীতিটি রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং মানবিকভাবে বিতর্কিত।

যদিও সরকার বলেছে যে শরণার্থী ও Humanitarian Protection রুট আলাদা থাকবে, ILPA সতর্ক করেছে যে নীতির ভাষা অস্পষ্ট এবং ভবিষ্যতে পরিবর্তনের ঝুঁকি রয়েছে। ILPA বলছে, ILR‑এর মূল উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং সমাজে পূর্ণ অংশগ্রহণ। Earned Settlement এই উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে এবং স্থায়ী বসবাসের ধারণাকে অযথা জটিল করে তোলে।

সরকার বলছে তারা “ব্যর্থতা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে”, কিন্তু ILPA বলছে, ব্যাকলগ, সিদ্ধান্তের গুণমান এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার মতো সমস্যাগুলোর সমাধান না করে নতুন নীতি চাপানো অযৌক্তিক। বিপুল সংখ্যক পরামর্শ প্রতিক্রিয়া দেখায় যে নীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে, কিন্তু সরকার এখনো স্পষ্টভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেনি।

 

 

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে টানা বৃষ্টি ও রোদের পর শেষ মে মাসে স্থিতিশীল আবহাওয়ার আভাস

অক্সফোর্ড স্ট্রিটকে ‘অপরাধের স্বর্গে’ পরিণত করবে সাদিক খানের পরিকল্পনাঃ স্থানীয়দের অভিযোগ

যুক্তরাজ্যে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে সংকটঃ ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের ৫ জনে ১ জন দারিদ্র্যে