কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর কোডিং প্ল্যাটফর্ম ‘কার্সর’-এর অভূতপূর্ব উত্থান এবার বিশ্ব প্রযুক্তি অঙ্গনে নতুন ইতিহাস গড়ল। মাত্র চার বছরের মধ্যে গড়ে ওঠা এই স্টার্টআপটি—যার সহ‑প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে রয়েছেন ভারতীয় বংশভূত এমআইটি প্রাক্তন ছাত্র অমন সাঙ্গার এবং পাকিস্তাানে জন্ম গ্রহনকারী সুলেহ আসিফ সম্প্রতি স্পেসএক্সের কাছে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের সর্ববৃহৎ অল‑স্টক চুক্তিতে অধিগৃহীত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে এটিকে এখন পর্যন্ত অন্যতম বৃহৎ অধিগ্রহণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কার্সর মূলত এমন একটি উন্নত কোডিং প্ল্যাটফর্ম, যা ডেভেলপারদের কোড লেখা, সম্পাদনা, ডিবাগিং এবং জটিল সফটওয়্যার কাঠামো বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা দেয়। দ্রুতগতির এই প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই এনভিডিয়া, অ্যাডোবি, উবার, শপিফাই, পেপ্যাল, সেলসফোর্স এবং স্যামসাং‑সহ বিশ্বের বহু শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হচ্ছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে প্ল্যাটফর্মটির রাজস্ব কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো শিল্পবিশেষজ্ঞদের বিস্মিত করেছে।
অমন সাঙ্গার—যিনি নিউ ইয়র্কে ভারতীয়‑উৎপত্তির পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন—শৈশব থেকেই প্রযুক্তির প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। এমআইটিতে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা শুরু করলেও পরে পড়া ছেড়ে দিয়ে তিনি সহ‑প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে মিলে ‘অ্যানিস্ফিয়ার’ নামে মূল কোম্পানি গড়ে তোলেন, যার অধীনে কার্সর পরিচালিত হয়। তাঁর বাবা অরবিন্দ সাঙ্গার আইআইটি বোম্বের প্রাক্তনী এবং জিওস্ফিয়ার ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা; মা শিল্পা সাঙ্গার একজন চিকিৎসক ও উদ্যোক্তা। পরিবারগত এই শক্তিশালী বৌদ্ধিক পরিবেশ অমনকে প্রযুক্তি‑উদ্ভাবনের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে বলে মনে করা হয়।
পাকিস্তানে জন্মগ্রহণকারী সুলেহ আসিফ আজ বৈশ্বিক প্রযুক্তি অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম। শৈশব থেকেই গণিত, যুক্তিবিদ্যা ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। প্রযুক্তির প্রতি এই স্বাভাবিক ঝোঁকই তাঁকে অল্প বয়সেই সফটওয়্যার উন্নয়ন ও অ্যালগরিদমিক চিন্তাধারার জগতে নিয়ে আসে।
পাকিস্তানে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। নতুন পরিবেশ, উন্নত গবেষণা‑সুযোগ এবং প্রযুক্তি‑কেন্দ্রিক একাডেমিক সংস্কৃতি তাঁর প্রতিভাকে আরও শাণিত করে। যুক্তরাষ্ট্রেই তাঁর প্রযুক্তি‑জীবনের প্রকৃত সূচনা ঘটে এবং এখানেই তিনি ভবিষ্যতের সহ‑প্রতিষ্ঠাতা অমন সাঙ্গার, মাইকেল ট্রুয়েল ও আরভিড লুন্নেমার্কের সঙ্গে পরিচিত হন। সহকর্মীদের মতে, সুলেহ আসিফের ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর শান্ত, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাশক্তি এবং জটিল সমস্যাকে সহজ, কার্যকর সমাধানে রূপান্তর করার ক্ষমতা। তাঁকে প্রায়ই বর্ণনা করা হয় এমন একজন প্রযুক্তি‑নেতা হিসেবে, যিনি “কোডের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভবিষ্যৎ” দেখতে পারেন।
স্পেসএক্সের এই অধিগ্রহণকে বিশেষজ্ঞরা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। মহাকাশ প্রযুক্তি, রোবোটিক্স এবং ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় জটিল সফটওয়্যার উন্নয়নে কার্সরের এআই‑চালিত কোডিং সক্ষমতা স্পেসএক্সকে আরও শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই চুক্তি ভারতীয়‑উৎপত্তির তরুণ উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক প্রযুক্তি নেতৃত্বে ক্রমবর্ধমান প্রভাবকেও নতুনভাবে সামনে এনেছে।
অমন সাঙ্গার ও সুলেহ আসিফের যৌথ উদ্যোগ ভারত‑পাকিস্তান উপমহাদেশের প্রতিভা ও উদ্ভাবনী শক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হচ্ছে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে স্টার্টআপ থেকে বিলিয়ন‑ডলারের অধিগ্রহণ—কার্সরের এই যাত্রা আগামী দিনের এআই‑চালিত প্রযুক্তি বিপ্লবের দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।
নাশিত রহমান || লন্ডন, ১৯ জুন ২০২৬

